Image description

বিদ্যুতের ভোগান্তি বেড়েছে। তবে শহরে তুলনামূলক কম লোডশেডিং হচ্ছে– এক থেকে দেড় ঘণ্টা। গ্রামে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। ময়মনসিংহ, খুলনা ও রংপুর বিভাগে লোডশেডিং তুলনামূলক বেশি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরিস্থিতি সহনীয়। একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে বিদ্যুতের যাওয়া-আসায় পল্লি মানুষের জীবনে নেমে এসেছে ভয়ানক দুর্ভোগ। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র শিল্প, বাণিজ্য। 

সরকারি তথ্যমতে, লোডশেডিং দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের চলমান সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়লার স্বল্পতা। এতে বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে দিনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। এ ছাড়া নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আসা বন্ধ রয়েছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার দ্বিগুণ হলেও ঘাটতি মেটাতে সরকার হিমশিম। লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলাতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। তবে এই লোড সমভাবে বণ্টন হচ্ছে না। রাজধানীসহ জেলা শহরগুলোতে নামমাত্র লোডশেডিং দিয়ে পল্লি অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিচালক (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বলেন, দেশের বড় দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার ও কক্সবাজারের মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে কম যাচ্ছে। এ দুই কেন্দ্রের কয়লার আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরীক্ষামূলক উৎপাদনে থাকা পটুয়াখালীর নোরিনকো কেন্দ্রটিও কয়লা সংকটে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে। এ ছাড়া রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ রয়েছে। এ কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, রামপালের ত্রুটিযুক্ত ইউনিটটি আজ রাতে চালু হতে পারে। এরপর হয়তো খানিকটা স্বস্তি মিলতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা শহরে লোডশেডিংকে নিরৎসাহিত করছি।

উৎপাদন ও ঘাটতি
চলতি মাসে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে লোডশেডিং। মাসের শুরুতে এক হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হলেও এখন তা দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। তেল-গ্যাস স্বল্পতায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এমনিতেই কম হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) চলতি মাসের জন্য ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চাইলেও দেওয়া হচ্ছে ৯২-৯৩ কোটি ঘনফুট। ব্যয়বহুল বলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কম চালানো হচ্ছে; এর সঙ্গে রয়েছে বকেয়া বিল। প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা থাকায় উদ্যোক্তারা তেল আমদানির ঋণপত্র খুলতে পারছেন না। 

গত রোববার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১০৩ মেগাওয়াট। সেদিন সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট। সোমবার সর্বোচ্চ বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল এক হাজার ১০০ মেগায়াট। মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখের ছুটি থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা কম ছিল। তারপরও এক হাজার মেগাওয়াটের ওপর লোডশেড করতে হয়। গতকাল বুধবার বিকেল ৪টায় সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার সময় প্রায় ১ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট লোডশেড করতে হয়। রাতে এই ঘাটতি আরও বাড়বে। কারণ, সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে।

বরিশাল
নববর্ষের প্রথম দিন মঙ্গলবার প্রায় ১২ ঘণ্টা অন্ধকারে ছিলেন বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলাবাসী। পিরোজপুর সদর উপজেলার কলাখালী ইউনিয়নের উদয়কাঠি গ্রামের বাসিন্দা বেলায়েত হোসেন সরদার জানান, আসা-যাওয়া খেলার মধ্যে চলছে বিদ্যুৎ। দিনরাত মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ-ছয়বার বিদ্যুৎ চলে যায়। একবার বিদ্যুৎ গেলে তা এক থেকে দেড় ঘণ্টা পরে আসে।

বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার বলেন, তাঁর আওতাধীন ২০টি ফিডারে অফপিক আওয়ারে (রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা) চাহিদা ৮৫ থেকে ৯০ মেগাওয়াট। তখন সরবরাহ পান ৩৫ থেকে ৪০ মেগাওয়াটের মধ্যে। পিক টাইমে চাহিদা আরও ১০ থেকে ১৫ মেগাওয়াট বেড়ে যায়। কিন্তু বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ে না। ফলে পিক টাইমে আরও বেশি লোডশেডিং করতে হয়। বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, তাঁর এলাকার গড় চাহিদা ৪৫ মেগাওয়াট। বর্তমানে সরবরাহ পাচ্ছেন ২০ মেগাওয়াট। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময়ে (বিকেল ৫টা) তাঁর আওতাধীন ৯টি ফিডারে একযোগে লোডশেডিং চলছিল বলে জানান এ নির্বাহী প্রকৌশলী। 

ওজোপাডিকোর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পিরোজপুর জেলা শহরসহ আশপাশের এলাকায় আট মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে চার থেকে সাত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

 

 

 

জেলা শহরের লোডশেডিংয়ের চিত্র তুলনামূলক সহনশীল হলেও গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি অসহনীয়। পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. আলতাপ হোসেন জানান, তাঁর সমিতির আওতায় গ্রাহকদের জন্য প্রতিদিন ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু গ্রিড থেকে ৩০-৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া জয়। 

ওজোপাডিকো বরগুনা অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান বলেন, তাদের গ্রাহকের চাহিদা সাড়ে সাত মেগাওয়াট; পাচ্ছেন ৩ দশমিক ৭ মেগাওয়াট। বরগুনা পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, তাদের গ্রাহক চাহিদা ১০ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে চার থেকে সাড়ে চার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

রংপুর
রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার আশরাফ আলী বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় লোডশেডিং দেওয়া হয় না। তবে বিভাগের গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে মাঝারি পর্যায়ের লোডশেডিং করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। 

নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফজলুর রহমান বলেন, শহরে বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ৮ থেকে ৯ মেগাওয়াট। গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার সানজিদ কুমার বলেন, বর্তমানে গ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ৬০ মেগাওয়াট। গড়ে পাওয়া যাচ্ছে ৪০ মেগাওয়াট। 

বিভাগের গাইবান্ধা সদর উপজেলার খোলাহাটি গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বোরো চাষে সব সময় জমিতে পানি রাখতে হয়। কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ আসে আর যায়। এ নিয়ে অনেক চিন্তায় আছি। গাইবান্ধা শহরের ব্রিজ রোডের ব্যবসায়ী ছবেদুল মিয়া বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। ফ্রিজে রাখা খাদ্যসামগ্রী নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

কুড়িগ্রামের শুভ দাস নামের এক ওয়েলডিং মিস্ত্রি বলেন, সকালে বিদ্যুৎ যাওয়ার দুই ঘণ্টা পর আসে। এতে কাজ সময়মতো শেষ হয় না। অমিত পাল নামের একজন ফ্রিল্যান্সার বলেন, কয়েক দিন থেকে দিনে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। ক্রেতাদের সঠিক সময়ে কাজ বুঝে দিতে অসুবিধা হচ্ছে। 

নেসকোর কুড়িগ্রাম কার্যালয় জানায়, জেলায় মোট ৭০-৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা। পাওয়া যাচ্ছে ৪০-৪৫ মেগাওয়াট। শহরে বিদ্যুতের ১২ মেগাওয়াটের চাহিদা বিপরীতে সর্বোচ্চ ৯ মেগাওয়াট মিলছে।

রাজশাহী
গতকাল বুধবার পিডিবি বগুড়ার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এমদাদুল হক জানান, তাদের বিদ্যুতের চাহিদা ৯৫ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে ৯০ মেগাওয়াটের মতো। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র প্রকৌশলী এমদাদুলের ভাষ্যের সঙ্গে মিলছে না। মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত শহরে লোডশেডিং হয়েছে পাঁচবার। এতে সব মিলিয়ে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। 

একই চিত্র রাজশাহী বিভাগের নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁতে। বিশেষ করে লালপুর, রাণীনগর, সিংড়া ও উল্লাপাড়ায় লোডশেডিং অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এসব উপজেলায় দৈনিক গড়ে ১০ ঘণ্টা ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে। 

নাটোরের লালপুর উপজেলার ফুলবাড়ী গ্রামের গৃহিণী তাবাছুম জান্নাত বলেন, সারাদিনে কতবার বিদ্যুৎ যায়, তার হিসাব নেই। গত কয়েক দিন শুধু রাতেই পাঁচ-ছয়বার লোডশেডিং হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে এক ঘণ্টা পরে আসে। গরমের কারণে ছোট ছোট বাচ্চারা ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। ঠিকমতো পড়াশোনাও হচ্ছে না। সংসারের কাজও ঠিকমতো করা যচ্ছে না।

লালপুরের অটোরিকশাচালক সোহেল আলী বলেন, পাঁচ সদস্যের সংসার আমার। এই অটো চালিয়েই সংসার চলে। রাতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ হচ্ছে না। চার্জ না থাকায় ঠিকমতো ভাড়াও মারতে পারছি না। সংসার চালানোই মুশকিল হয়ে গেছে।

নওগাঁর রানীনগর উপজেলার কসবাপাড়া গ্রামের বিদ্যুৎ চালিত গভীর নলকূপের মালিক আনিছুর খান বলেন, তাঁর গভীর নলকূপের আওতায় প্রায় ২৯০ বিঘা বোরো জমি রয়েছে। গত ১৫ দিন ধরে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে চরম বেকায়দায় পড়েছি। ঠিকমতো জমিতে সেচ দিতে পারছি না। এমন পরিস্থিতি যদি আরও কয়েক দিন চলে, তাহলে ধানের চরম ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিলেট
সিলেট বিভাগে সরকারি চিত্রমতে, বিদ্যুতের চাহিদা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান ৩০ ভাগ। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এ বিভাগের জগন্নাথপুর, জুড়ী, ধর্মপাশা, মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলায় বর্তমানে দিনের অর্ধেকের বেশি সময় লোডশেডিং হচ্ছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলায় পিডিবির বিদ্যুতের প্রতিদিন চাহিদা ১৫০-১৫৫ মেগাওয়াট এবং বিভাগে চাহিদা ২৪০-২৫০ মেগাওয়াট। বিপরীতে জেলায় ১১০ ও বিভাগে ১৬০ মেগাওয়াট বিদুৎ সরবরাহ হচ্ছে।

সিলেট বিদ্যুৎ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন জানান, চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ হওয়ায় বর্তমানে ৩০ ভাগ ঘাটতি রয়েছে। 

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে গত মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার লোডশেডিং হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর থেকে যে কয়বার লোডশেডিং হয়েছে তা স্থায়ী হয়েছে দুই আড়াই ঘণ্টারও বেশি। ধর্মপাশা গ্রামের গাছতলা বাজারের ইলেকট্রিক ব্যবসায়ী আশরাফুল আলম বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে। 

চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বিভাগের তিনটি উপজেলার বিদ্যুৎ সরবরাহের চিত্র জানতে পেরেছে সমকাল। এ তিনটি উপজেলা হচ্ছে কুমিল্লার হোমনা ও মেঘনা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর। এ তিনটি উপজেলাতেই তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। 

কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর আওতাধীন হোমনায় বিদ্যুতের চাহিদা ২০ মেগাওয়াট, পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট। মেঘনায় চাহিদা প্রায় ১১ মেগাওয়াট। মিলছে মাত্র চার মেগাওয়াট। 

বাঞ্ছারামপুর জোনাল অফিসের এজিএম (কম) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে গড়ে সদরে লোডশেডিং ৬৭ শতাংশ আর ফরদাবাদে ৪৫ শতাংশ লোডশেডিং চলছে। 

বাঞ্ছারামপুরের রূপসদী দক্ষিণপাড়ার ব্লক ম্যানেজার সালেহ আহমেদ জানান, দিনরাতে বিদ্যুৎ থাকে না, জমিতে ঠিকভাবে সেচ দিতে পারছি না, সময়মতো সেচ দিতে না পারায় কৃষকরা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে।

ফরদাবাদ গ্রামের স্কুলশিক্ষিকা রাশিদা আক্তার বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। একবার গেলে কয়েক ঘণ্টা আসে না। রাতে ঘুমাতে পারি না, দিনে কাজ করাও কঠিন হয়ে গেছে। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

পৌর এলাকার মাহফুজ আহমেদ জানান, মঙ্গলবার সারারাতে দুই-আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল মাত্র। গরমে রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমাতে পারিনি। ঘরে থাকাই কষ্ট হয়ে উঠেছিল। বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। দিন-রাতে মনে হয় ২০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।

ঢাকা
ঢাকা বিভাগের পাঁচটি জেলা ও আটটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বত্রই লোডশেডিং পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তবে দু-একটি জেলা ও উপজেলা শহরে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। আলফাডাঙ্গা, গোয়ালন্দ, বাজিতপুর, বোয়ালমারী, শিবালয় ও লৌহজংয়ে চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। অপরদিকে রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে লোডশেডিং পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয়। 

ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানীর গোপালগঞ্জ নির্বাহী প্রকৌশলী মঈন উদ্দিন বলেন, শহরে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ পিডিবির আওতাধীন শহর এলাকায় সাড়ে ২৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে ২০ মেগাওয়াট। জেলার পল্লী বিদ্যুতের এলাকায় চাহিদা ৯০ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে ৬০ মেগাওয়াট। রাজবাড়ী জেলায় মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৯০ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে ৭০ মেগাওয়াট।

মুন্সীগঞ্জ শহরের বাসিন্দা ও অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নাফিসা বিনতে উর্বনা বলেন, দিনে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যায়। কখনও এক ঘণ্টা, কখনও দুই ঘণ্টা থাকে না। পড়াশোনার সময়ই বেশি বিদ্যুৎ যায়। এতে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে।

মুক্তারপুর এলাকার ব্যবসায়ী হেলালউদ্দিন সরদার বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ, কাঠের কারখানা, প্রিন্টিং প্রেসসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় পানিরও সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ বিদ্যুৎ না থাকলে মোটর চালিয়ে পানি তোলা সম্ভব হয় না।

ফরিদপুরের বোয়ালমারীর সুতাশী এলাকার বিকাশ এগ্রো ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিজয় সাহা বলেন, ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চাল উৎপাদন ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। শ্রমিকদের বসিয়ে মজুরি দিতে হচ্ছে। জেনারেটর চালাব, সেই জ্বালানি তেলও পাওয়া যাচ্ছে না।

ভাটপাড়া এলাকার আল আলী অটো ব্রিকসের পরিচালক সবুজ মিয়া বলেন, বিদ্যুৎ আর জ্বালানি তেলের সংকটে ইটভাটা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। দিনে ছয়-আটবার বিদ্যুৎ চলে যায়।

বোয়ালমারী সদর বাজারের ব্যবসায়ী কাজী মোহাম্মদ রায়হান বলেন, মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৮ থেকে ৯ বার বিদ্যুৎ গেছে। দুই ঘণ্টা পর এসে ১০-২০ মিনিট থেকে চলে যায়। আইপিএস ঠিকভাবে চার্জও হয় না।

খুলনা
গত মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাঁচবার লোডশেডিং হয়েছে। সর্বনিম্ন ৩৭ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা ১৮ মিনিট পর্যন্ত মোট পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না এসব এলাকায়। এ বিভাগের খুলনা, যশোর ও বাগেরহাট অঞ্চলের পরিস্থিতির তুলনায় সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও মাগুরা অঞ্চলে বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে। 

ওজোপাডিকোর প্রধান প্রকৌশলী এটিএম তারিকুল ইসলাম জানান, ১৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে বারবার লোডশেড করতে হচ্ছে।

মাগুরা ওজোপডিকোর প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, তাদের অধীনে মোট ৯টি ফিডার রয়েছে। ৩-৪ ঘণ্টা পরপর একেকটি ফিডারে এক ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।

মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার কমলাপুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মুসাফির জানান, শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও গ্রাম এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের অবস্থা নাজুক। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে তিন থেকে চার ঘণ্টা পর আসছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। এতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দিনে চাহিদা ২৩ মেগাওয়াট। পাওয়া যায় ১০-১২ মেগাওয়াট। যশোরের অভয়নগরে প্রতিদিন চাহিদা রয়েছে ৩৭/৩৮ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে ২৫ থেকে ২৬ মেগাওয়াট।

উপজেলার আবাচন্ডিপুর গ্রামের মিজানুর রহমান, চালতেঘাটার কামরুল ইসলামসহ অন্যরা জানান, মঙ্গলবার রাত ১০টার সময় থেকে বুধবার পর্যন্ত তাদের এলাকায় অন্তত ১০ বার বিদ্যুৎ যায়। তবে উপজেলার পৌর সদরের ক্ষেত্রে একই সময়ে মোট সাতবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। গ্রামাঞ্চলে প্রতিবার বিদ্যুৎ গিয়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা, এমনকি আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। পৌর সদরের ক্ষেত্রে লোডশেডিং ছিল ৩০ মিনিট থেকে ৬০ মিনিট। অবস্থানভেদে তা দেড় ঘণ্টায় পৌঁছায়।

ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ জেলায় বিভিন্ন সময়ে ৫০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র আরও ভয়াবহ। তারাকান্দা, ফুলপুর, ধোবাউড়া, ফুলবাড়িয়া ও মুক্তাগাছা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল। এ বিভাগের জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে গত বুধবার দিনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৪ মেগাওয়াট। 

এই লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ময়মনসিংহের মাছচাষিরা। সদর উপজেলার চর বড়বিলা এলাকার মাছচাষি সারোয়ার হোসেন বলেন, এখন প্রচণ্ড গরম শুরু না হলেও লোডশেডিংয়ের কারণে মাছ চাষে বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। বৈশাখ মাসে পুকুরে সারাক্ষণ পানি দিতে হয়। দিনের বড় একটা সময় লোডশেডিং থাকায় সেচ কার্যক্রম বন্ধ থাকছে। এতে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, বিশেষ করে যারা মাছের রেণু বা পোনা উৎপাদন করেন, তাদের ক্ষতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
(তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)