Image description

মঙ্গলবার রাত তখন সাড়ে ১০টা পেরিয়েছে। বরগুনার পাথরঘাটা কেন্দ্রীয় কবরস্থানে বাতাসে মিশে আছে কাঁচা মাটির গন্ধ। দূরে একটি কবর খোঁড়া হচ্ছে। আলো কম, মানুষও হাতেগোনা।

 

এই নিঃশব্দ আয়োজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মেহেদী শিকদার। চেনা কোনো মুখ নয়, তবু অনেক অচেনা মানুষের শেষ ভরসা তিনি। 

মারিয়া নামের এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তার মৃত্যুর খবর নিতেও আসেনি কেউ।

এই মারিয়ার জন্যই রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছেন মেহেদী। মাত্র সাতজনের উপস্থিতিতে জানাজা হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। 

 

ইমামসহ ওই ছয়জনকে ফোন করে, অনুরোধ করে জোগাড় করতে হয়েছে মেহেদীকেই। এরপর কবরের ব্যবস্থা, দাফন- সব আয়োজনই একা সামলাচ্ছেন তিনি।

 

কিশোরী মারিয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি অন্যরকম। থানায় মামলা হয়েছে। মেয়ের মরদেহ থানায় রেখে মা লাপাত্তা। তাই পুলিশ জানিয়ে দেয়, পরিবার ছাড়া দাফন করা যাবে না। রাত ১২টার দিকে মরদেহ থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

 

আজ বুধবার পরিবারের অন্য সদস্যরা থানায় যাওয়ার পর লাশ দাফনের অনুমতি মেলে। সকাল ১০টার দিকে কিশোরী মারিয়ার  দাফন সম্পন্ন হয়। মেহেদী নিজেই মারিয়ার মরদেহ কবরে নামান। তার সঙ্গে ছিলেন কবর খোঁড়ার শ্রমিক হাসান। তবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন ছাত্রদলের খায়রুল ইসলাম শরীফসহ অনেকেই।

কেউ না থাকলে আমাদেরই থাকতে হবে
‘শেষ সময়ে যেন কেউ একা না থাকে’, এই কথাটাই মেহেদীর ভরসা। কেন করেন এমন কাজ?- প্রশ্নটি শুনে একটু চুপ থাকেন মেহেদি। তারপর বলেন, ‘কেউ না থাকলে তো আমাদেরই থাকতে হবে। আজ যদি আমি না যাই, কাল আমার জন্যও হয়তো কেউ থাকবে না।’

মেহেদীর এই পথচলা নতুন নয়। করোনা মহামারির সময় নিজ হাতে লাশ দাহ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। পাথরঘাটা এলাকার মানুষ জানেন, পরিবারহীন বা অচেনা মৃতের খবর পেলেই তিনি ছুটে যান। কখনও হাসপাতালের মর্গ, কখনও নদীর ঘাট, কখনও কোনো নির্জন বাড়ি। সেখান থেকেই করেন লাশের শেষযাত্রার আয়োজন।

কাজটি শুধু শারীরিক পরিশ্রমের নয়, রয়েছে এক ধরনের নীরব মানসিক চাপও। মেহেদী বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন হয় যখন দেখি, মৃতের পাশে কেউ নেই। একটা মানুষ সারাজীবন কাটিয়ে শেষে একদম একা হয়ে যায়, এটা মানতে কষ্ট হয়।’

উদাহরণ টেনে মেহেদী জানান, করোনাকালে পৌর শহরের এক শিক্ষক মারা যান। ঘরে তাঁর স্ত্রী ও ছোট সন্তান। স্বজন তো দূরের কথা, প্রতিবেশীরাও তখন ঘর থেকে বের হননি। একাই লাশ উদ্ধার করে শ্মশানে নিয়ে দাহ করতে হয়েছে তাঁকে।

আদালত পর্যন্ত গড়ায় ঘটনা
তিক্ত অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে মেহেদীকে। গত বছরের শেষ দিকে মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারী অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে উদ্ধার করে পাথরঘাটা হাসপাতালে ভর্তি করা হলে মারা যান তিনি। 

ওই ঘটনায় পাথরঘাটা থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়। সেই মামলায় পাথরঘাটা চৌকি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি মেহেদিকে আসামি হিসেবে সমন জারি করেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিতে হয় তাকে।

সমাজ যেভাবে দেখে
মেহেদী বলেন, ‘সমাজ এই কাজকে একরকম দেখে না। কেউ প্রশংসা করেন, কেউ দূর থেকে তাকিয়ে থাকেন, কেউ এড়িয়ে চলেন।’ তিনি বলেন, ‘অনেকে বলে, এসব কাজ করলে মন খারাপ হয়ে যায়, দূরে থাকাই ভালো। কিন্তু আমি ভাবি, যদি সবাই দূরে থাকে, তাহলে কাছে কে আসবে ‘

মেহেদীর এই কাজে কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন নেই, নেই স্থায়ী সহায়তাও। তবে রক্তদান সংগঠন 'প্রত্যয়'র সঙ্গে জড়িতরা প্রায়ই তাঁকে সহযোগিতা করেন। কখনও নিজের পকেট থেকে খরচ করেন, কখনও স্থানীয়দের কাছ থেকে সামান্য সহযোগিতা জোগাড় হয়। তবু থেমে থাকে না কাজ।

করোনার পর থেকে আজ বুধবার পর্যন্ত ১০ জনের দাফন করেছেন মেহেদী। তাদের মধ্যে ৯ জনই ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন, যাদের মধ্যে চারজন নারী।

সাংবাদিক ইমাম হোসেন নাহিদ বলেন, এই শহরের ভিড়ে, খবরের কাগজের শিরোনামের বাইরে মেহেদীর মতো কিছু মানুষ আছেন, যারা শেষযাত্রার সঙ্গী হন। তারা কোনো আলো চান না, কোনো স্বীকৃতিও নয়, শুধু চান, একজন মানুষ যেন শেষ মুহূর্তে একা না থাকেন।

সমাজসেবক এরফান আহমেদ সোয়ান বলেন, পাথরঘাটার কবরস্থানে সেই রাতটি শুধু একটি দাফনের গল্প নয়, এটি এক মানুষের দায়বোধের গল্প, যেখানে অচেনা মানুষও শেষ পর্যন্ত আপন হয়ে ওঠে।

মারিয়ার পরিবার যা বলছে
মারিয়ার বয়স ১৫ বছর। দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনা থেকে দূরে ছিল সে। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তার মা নাসিমা বেগম ভিক্ষাবৃত্তি করে সংসার চালাতেন। মা-মেয়ের বসবাস ছিল উপজেলার কাল‌মেঘা ইউনিয়নের এক‌টি প‌রিত‌্যক্ত ঘ‌রে।

মা নাসিমা বেগমের দাবি, প্রতিবেশী রুহুল আমিনের সঙ্গে প্রেমঘটিত একটি সম্পর্ককে কেন্দ্র করে পরিবারে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। এর পরই শুরু হয় অস্থিরতা। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যেই ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি।

পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এনামুল হক বলেন, বুধবার সকালে মরদেহ গ্রহণের জন্য পরিবারকে থানায় আসতে বলা হয়েছিল। আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ বুঝে নেন। পরে পৌর এলাকায় দাফন সম্পন্ন হয়।