একটু ভালো থাকার স্বপ্ন নিয়ে কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে অন্যদের সঙ্গে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেন দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার জোতবানী ইউনিয়নের ভাইগর গ্রামের ছইফুদ্দিনের ছেলে বিষু মিয়া (৪৫)। রাতে তিনি স্ত্রীকে ফোনে জানান, পৌঁছে আবার ফোন করবেন। কিন্তু সকালে পরিবারের কাছে খবর আসে তার স্বামী আর বেঁচে নেই।
শুধু বিষু মিয়া নন, আরও ১৩ জন ওই একই উদ্দেশ্যে কৃষি শ্রমিক হিসেবে ধান কাটতে যান। তাদের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত হন। নিহত সবাই দিনাজপুরের বাসিন্দা। এর মধ্যে বিরামপুর উপজেলার ভাইগর এলাকার ৪ জন এবং নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিবপুর গ্রামের ৩ জন রয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে বিরামপুরের জোতবানী ইউনিয়নের ভাইগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে মানুষের ভিড়। স্বজনদের কান্নায় পুরো এলাকা ভারী হয়ে উঠেছে। পরিবারগুলোতে চলছে শোকের মাতম। দুর্ঘটনায় ওই এলাকার পলাশ ইসলামের ছেলে সুমন, ছইফুদ্দিনের ছেলে বিষু মিয়া, মজিরুল ইসলামের ছেলে আবু হোসেন এবং রকিবুল্লাহর ছেলে আব্দুর রশিদ নিহত হন। এছাড়া পার্শ্ববর্তী নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিবপুর গ্রামের আজাদ হোসেনের ছেলে আফজাল হোসেন, আলম হোসেনের ছেলে সোহরাব হোসেন এবং ফজলু রহমানের ছেলে সালেক নিহত হন।
আব্দুর রশিদের মেয়ে রিয়া মনি বলেন, আমার বাবা একজন হতদরিদ্র মানুষ ছিলেন। সংসারের আর্থিক সমস্যার কারণে তিনি কাজ করতে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে ট্রাক চাপায় তার মৃত্যু হয়। আমরা ছয় বোন, সবাই বিবাহিত। অভাবের কারণে বৃদ্ধ মাকে বাড়িতে রেখে বাবা কাজে গিয়েছিলেন। কিন্তু জানতাম না, সেখানে গিয়ে তিনি ট্রাক চাপায় মৃত্যুবরণ করবেন।
নিহতদের একজনের স্ত্রী লায়লা বানু বলেন, সকাল ১০টায় তিনি বাড়ি থেকে বের হন। যাওয়ার সময় বলেন, কাজ করে কিছু টাকা রোজগার করতে হবে। পরদিন সকালে তার মৃত্যুর খবর পাই। সুস্থ মানুষটা বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে এলো না। আমি যেতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু তিনি শোনেননি।
নিহত বিষু মিয়ার স্ত্রী রুকসানা বলেন, কাল সকাল ১০টায় খাওয়া-দাওয়া করে গাড়িতে উঠেছিলেন। গাড়িতে উঠেই ফোন করে বলেন, আমি গাড়িতে উঠেছি। আজ তার মৃত্যুর খবর পাই। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালানোর জন্যই তিনি কাজে গিয়েছিলেন। এখন সন্তানদের পড়ালেখা কীভাবে চালাবো বুঝতে পারছি না।
তার মা হোসনারা বলেন, কাল সকাল ১০টায় কাজের কথা বলে তিনি বাড়ি থেকে বের হন। যাওয়ার সময় বলেন, কাজ করে কিছু টাকা আয় করবেন, বাচ্চাদের লেখাপড়ার খরচ দেবেন, বাসায় চালও নেই। কাজে পৌঁছেই ফোন দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আর কোনো ফোন আসেনি। পরে সকাল ৭টায় তার মৃত্যুর খবর জানা যায়।
খলিলুর রহমান বলেন, নিহত বিষু মিয়া আমার ভাতিজা। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে, ছোট মেয়ের বয়স আট বছর। গতকাল কাজের খোঁজে বাড়ি থেকে বের হয়ে তিনি ট্রাক চাপায় নিহত হন। আমরা কেউই এমন ঘটনা ভাবতে পারিনি।
এলাকার মোহাম্মদ গফফার বলেন, আমার কোনো জমি নেই। আমি দিনমজুর হিসেবে সংসার চালাই। অভাবের কারণে কাজের খোঁজে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ফরিদপুরে যেতে হয়। তাদের সবারই পরিবার আছে। এখন তাদের সংসার কীভাবে চলবে, জানি না।
মোকসেদুল ইসলাম বলেন, তাদের মৃত্যুর খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা থানায় যোগাযোগ করি। তাদের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। তাদের মধ্যে একজনের পরিবারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে, আরেকজনের ছয়টি মেয়ে, আরেকজনের এক ছেলে ও এক মেয়ে, আরেকজনের কোনো সন্তান নেই। সবাই অসহায় ও দিনমজুর। কাজের খোঁজে তারা কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে গিয়েছিলেন। কেউই এমন দুর্ঘটনা ঘটবে ভাবতে পারেনি। বিষয়টি মন্ত্রী মহোদয়কে জানানো হয়েছে, তিনি কিছু সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন।
দিনাজপুর পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা জানান, কুমিল্লার দাউদকান্দিতে সংঘটিত এই দুর্ঘটনায় বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার সাতজন নিহত হয়েছেন। কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। নিহতদের সরকারিভাবে ২৫ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও তিনি জানান।