টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে চার বছর আগে সংঘটিত এক চাঞ্চল্যকর ‘ক্লুলেস’ হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ তদন্ত, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে এ ঘটনায় জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) রাতে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ২০২১ সালের ২১ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ৮টা ৪০ মিনিটে মির্জাপুর থানার পাকুল্ল্যা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অপেক্ষায় ছিলেন অটোচালক গোলাম রাব্বি (২২)। ওই সময় তিনজন ব্যক্তি যাত্রীবেশে তার অটোতে ওঠেন। প্রথমে স্বাভাবিক যাত্রীর মতো আচরণ করলেও কিছু দূর যাওয়ার পর তারা চালককে নির্জন স্থানে যাওয়ার জন্য প্ররোচিত করেন।
একপর্যায়ে ভাতগ্রাম পশ্চিমপাড়া এলাকায় পৌঁছে কৌশলে তাকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহ পাশের একটি ডোবার কাদার মধ্যে ফেলে রেখে অটোটি ছিনতাই করে দ্রুত পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
পরদিন সকালে স্থানীয় লোকজন দুর্গন্ধ পেয়ে ডোবার মধ্যে মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। এ ঘটনায় নিহতের পিতা বাদী হয়ে মির্জাপুর থানায় হত্যা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করলেও দীর্ঘদিনেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় এটি ‘ক্লুলেস’ হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৬ জুন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে মামলাটি পিবিআই, টাঙ্গাইল জেলায় হস্তান্তর করা হয়।
তদন্তভার গ্রহণের পর পিবিআই আধুনিক প্রযুক্তি, কলডাটা বিশ্লেষণ, গোপন সূত্র এবং মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ঘটনার সূত্র খুঁজে বের করে। একাধিক সন্দেহভাজনকে নজরদারিতে এনে জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রথমে ইব্রাহিম হোসেন টুটুল (৩০) ও রুবেল হোসেনকে (৩৫) গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার তদন্ত আরও অগ্রসর হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৩ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার তামাই এলাকা থেকে জুবায়ের হোসেন পারভেজকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে অটোচালককে টার্গেট করে। যাত্রীবেশে অটোতে উঠে তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে অটো ছিনতাই করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। ঘটনার পর তারা আত্মগোপনে চলে যায় এবং বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান পরিবর্তন করে দীর্ঘদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে।
পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, এই মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত এবং ধৈর্যশীল অনুসন্ধান বড় ভূমিকা রেখেছে। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার আসামিদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় সহায়ক হবে।
এদিকে এ ঘটনায় জড়িত আরও পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম এখনও চলমান আছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।