মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার আল্লাহ করিম মসজিদ থেকে বছিলামুখী মোহাম্মদপুরের চার রাস্তার মোড় পর্যন্ত ফুটপাতের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে কাইল্লা বাদল গ্রুপ। সড়কের পাশের এসব অস্থায়ী দোকান থেকে মাসে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করে গ্রুপটি। দীর্ঘদিন থেকেই ফুটপাতের এই অংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে এলেক্স ইমন গ্রুপও। আধিপত্যের এই দ্বন্দ্বে বেশ কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়ায় এলেক্স ইমন ও কাইল্লা বাদল গ্রুপ। এসব সংঘর্ষের ধারাবাহিকতায় গত রোববার কাইল্লা বাদল গ্রুপের সদস্যদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন ইমন।
গতকাল মোহাম্মদপুরের সড়কের এই অংশের ফুটপাতের দোকানদার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। সরেজমিন দেখা যায়, আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে থেকে মোহাম্মদপুর চার রাস্তার মোড় পর্যন্ত অন্তত দুইশ অস্থায়ী দোকান আছে। ফল, তরিতরকারি থেকে শুরু করে কাপড়, জুতা ও নানা পণ্যের রমরমা ব্যবসা হয় এসব দোকানে। এই ফুটপাতে নিয়মিত দোকান করেন এমন এক ব্যক্তি বলেন, এখানে দোকানপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা চাঁদা দিতে হয় প্রতিদিন। নানা সময় এসব চাঁদার নিয়ন্ত্রণ করে নানা মহলের মানুষ। আমরা এসব বুঝতে পারি, যখন লাইনম্যান (দোকানে দোকানে চাঁদা আদায় যে করে) বদলায় তখন। ৫ আগস্টের পরে যারা চাঁদা নিতে আসত, তারা ইমন ও বাদলের লোক বলেই জানতাম। হুট করে দেখি, লাইনম্যান দুজন। একজন এসে ইমনের নামে চাঁদা চায়, আরেকজন এসে চাঁদা চায় বাদলের নামে। গত প্রায় আড়াই মাস থেকে এমন হচ্ছিল। পরে জানতে পারি, ইমন ও বাদল আলাদা হয়ে গেছে। আলাদা হওয়ার পর থেকেই তাদের অনুসারীদের বিভিন্ন সময় মারামারি করতে দেখেছি। সেই মারামারিতে গত রোববার ইমনকে হত্যা পর্যন্ত গড়াল।
এখানকার চাঁদাবাজির ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ এসেছে কালবেলার হাতে। আনুমানিক দুই সপ্তাহ আগের এই ভিডিওতে দেখা গেছে, কাইল্লা বাদল গ্রুপের একাধিক সদস্য দিনদুপুরে দোকানদারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে। সাদা ও হালকা মেরুন রঙের চেক হাফহাতা শার্ট পরিহিত এক যুবক রাস্তার ধারে বসানো তরিতরকারির দোকান থেকে একাধারে টাকা নিচ্ছেন। সেই যুবক দোকানগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দোকানদার টাকা দিয়ে দিচ্ছেন।
আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি স্বীকার করলেও চাঁদাবাজি নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়টি অস্বীকার করেছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেসবাহ উদ্দিন বলেন, ‘এই সড়কের ফুটপাতের চাঁদাবাজি নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল—এমনটা আমার জানা নেই। তারা তো রায়েরবাজারকেন্দ্রিক, এখানে আসবে কেন?’
যেভাবে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড হলো: গত রোববার দুপুরের পরে রায়েরবাজার পাবনা গলি এলাকায় কাইল্লা বাদল ও তার কয়েকজন সহযোগীকে দেখতে পায় এলেক্স ইমন গ্রুপের সদস্যরা। তখন ইমন ও তার সহযোগীরা কাইল্লা বাদল গ্রুপের সদস্যদের ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে বাদলসহ অন্য সহযোগীরা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এর প্রায় আনুমানিক ঘণ্টাখানেক পরে বাদল তার গ্রুপের ১৫-২০ জন সদস্য নিয়ে ইমন গ্রুপের ওপর অতর্কিত পাল্টা হামলা চালায় রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী রোডের বেড়িবাঁধের ঢালে। ওই সময় ইমনের সঙ্গে থাকা অন্য সহযোগীরা দৌড়ে পালিয়ে গেলেও এলেক্স ইমন পালাতে পারেননি। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই হামলায় কাইল্লা বাদল গ্রুপের সদস্য আরমান ওরফে শাহরুখ, কাল্লু, ইয়াসিন, চিকু শাকিল, পেটকা তুহিন, ভান্ডারী ইমন, নেকেট শাকিলসহ অন্তত ১৫ জনের একটি দল তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে।
যদিও ঘটনার দিনই খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে মো. সাইফ (২৩), তুহিন (২০) ও মো. রাব্বি কাজী (২৫) নামে তিনজনকে আটক করেছিল পুলিশ। তাদের কাছ থেকে তিনটি চাপাতি, একটি কাটার ও একটি স্টিলের পাতও উদ্ধার করা হয়। ঘটনার এক দিন পর গতকাল সোমবার দুপুরে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সুমনকেও গ্রেপ্তার করেছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। এ বিষয়ে থানার ওসি মেসবাহ উদ্দিন বলেন, এ ঘটনায় গত রোববার তিনজন ও গতকাল সোমবার একজনসহ মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার সবাই চিহ্নিত অপরাধী সন্ত্রাসী। ইমনও এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। হত্যাসহ নানা অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে তার নামে ১৮টি মামলা আছে।
চাঁদাবাজি নিয়ে আগেও রক্তাক্ত সংঘর্ষে জড়িয়েছে দুই গ্রুপ: গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলার ময়ূর ভিলা এলাকায় মো. রাসেল (৩৭) ও মো. মামুন (৩২) নামে দুজনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। এই রাসেল ও মামুন ইমন গ্রুপের সদস্য। এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টা মামলা হয় মোহাম্মদপুর থানায়। এই মামলায় র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় সোহেল ওরফে গ্যারেজ সোহেল। গত পহেলা মার্চ গ্রেপ্তার হওয়ার পরে র্যাবের কাছে প্রাথমিক স্বীকারোক্তিতে চাঁদাবাজির দ্বন্দ্বের কথা স্বীকার করে তারা। এই রাসেল বাদল গ্রুপের সক্রিয় সদস্য।
মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় মোট আটটি কিশোর গ্যাং বর্তমানে সক্রিয় আছে। র্যাব-২-এর করা তালিকা অনুযায়ী গ্যাংগুলো হলো—কবজিকাটা গ্রুপ, কিলার আরমান গ্রুপ, টুন্ডা বাবু গ্রুপ, বোমা গ্রুপ, গিঁটঠা গ্রুপ, কসাই গ্রুপ, পাটালি গ্রুপ ও এলেক্স। টুন্ডা বাবু গ্রুপ বেশি সক্রিয় শ্যামলী ও আগারগাঁও এলাকায়। এ ছাড়া বাকি গ্রুপগুলো মোহাম্মদপুর ও আদাবরকেন্দ্রিক। স্থানীয়রা জানান, গত বছরের ৫ আগস্টের আগে পাটালি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিল ফর্মা সজীব। তার অবর্তমানে ফর্মা আলমগীর ও ফালান এই গ্রুপটির নেতৃত্ব দিচ্ছে। এ ছাড়া এলেক্স গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করছেন এলেক্স ইমন ও সোহাগ। কবজিকাটা গ্রুপসহ এই দুটি গ্রুপ সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। বাকিগুলো এলাকায় এই তিন গ্রুপের তুলনায় কম সক্রিয় ও লোকবলসম্পন্ন।