রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সরকারি হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে আশপাশে ৬০টিরও বেশি ছোট বড় বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধ, আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি ও খাবার সরবরাহের কাজ ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় স্থানীয় গ্রুপগুলো মাসিক চাঁদাবাজির বিনিময়ে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিটি হাসপাতাল থেকে মাসে গড়ে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয়। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর এই চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটের হাত বদল হয়। আগে মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর থানা এলাকার যুবলীগের সিন্ডিকেট এই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করত।
বর্তমানে একটি চাঁদাবাজ গ্রুপ ক্ষমতাসীনদের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে এলাকায় একক চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠা করেছে। এরই জের ধরে শ্যামলীর ৩ নম্বর রোডের সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালে গরিবের চিকিত্সক বলে খ্যাত ডা. কামরুল ইসলামের কাছে হাসপাতাল থেকে মাসিক চাঁদা ৫ লাখ টাকা দাবি করে যুবদলের নামধারী মঈন উদ্দিন। কিন্তু ডা. কামরুল ইসলাম চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে এই বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় অর্থপেডিক্স ও পুনর্বাসন ইনস্টিটিউট, জাতীয় হূদেরাগ হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, জাতীয় টিবি হাসপাতাল, জাতীয় নিউরোসায়েন্স মেডিক্যাল ও ইনস্টিটিউট ও জাতীয় শিশু হাসপাতালকে কেন্দ্র করে আশপাশে গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থান শেরেবাংলা নগর, মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা এলাকায়।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চাঁদাবাজির লিখিত কোনো অভিযোগ থানায় কেউ করেনি। তবে এসকেডি ইউরোলজি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে চাঁদাবাজির মামলা দায়েরের পর থেকে এই এলাকার অনেক বেসরকারি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ মুখ খুলতে শুরু করেছে। এই এলাকায় মঈনের নেতৃত্বে একটি অলিখিত চাঁদাবাজ গ্রুপ তৈরি হয়েছে। ৫ আগস্টের পর জেল থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর শেল্টারে মঈন বাহিনী দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়ায়। এর পাশাপাশি মিরপুর ও পল্লবী এলাকার একটি চাঁদাবাজ গ্রুপের গডফাদারের সরাসরি মঈন বাহিনীর ওপর আশীর্বাদ রয়েছে।
মিরপুরের চাঁদাবাজ গ্রুপটি মঈন বাহিনীকে দিয়ে আগারগাঁওয়ে স্ট্রিট ফুডের প্রায় ৩০০ দোকান নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এই এলাকায় প্রায় ৩০০ ভাসমান দোকান বসে। প্রতিটি দোকান থেকে মাসে ৫ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা চাঁদা তোলে মঈন বাহিনীর সদস্যরা। স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলোর মাসিক চাঁদাবাজি মঈন বাহিনীসহ তিনটি গ্রুপের কাছে ভাগাভাগি হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেরেবাংলা নগর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের মালিক বলেন, ‘এই বাহিনীর অত্যাচারে গত দেড় বছর ধরে আমরা অতিষ্ঠ। নির্বাচনের আগে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে চাঁদা নিত। নির্বাচনের পর থেকে এক লাফে তা ১ লাখ টাকা করেছে। চাঁদা না দিলে মেরে ফেলাসহ প্রতিষ্ঠান দখল করে নেওয়ার হুমকি দেয় তারা। আর আইনি সহায়তা নিলে আরো খারাপ হবে বলেও ভয় দেখায়।’
মঈন বাহিনীর কর্মকাণ্ড কেবল চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি শেরেবাংলা এলাকায় জমি দখল, সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ি দখল এবং মাদক কারবারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এমনকি সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জমি ও কার্যক্রমের ওপরও তাদের হস্তক্ষেপের খবর পাওয়া গেছে। এলাকার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এই বাহিনীর সদস্যরা মাদকের আসর বসায় এবং মাদক কেনাবেচা করে।
শেরেবাংলা নগর এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে মঈন উদ্দিন কয়েকটি কিশোর গ্যাং গ্রুপকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। এই কিশোর গ্যাংগুলোর সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত হয়রানি করছে। কেউ এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি ও নাজেহাল করা হয়।
এছাড়া, শ্যামলী এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সরবরাহ করেন মঈন। অনেক হোটেলে চলে রমরমা যৌন ব্যবসা। এর নিয়ন্ত্রণও মঈনের হাতে। হোটেলগুলো থেকে মাসিক চাঁদা নেয় তার বাহিনী।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবসায় মঈন বাহিনীকে মাসোহারা দিতে হয়। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েনসেস ও হাসপাতালের সামনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস স্ট্যান্ডটিও মঈন বাহিনীর হাতে জিম্মি।
সম্প্র্রতি জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদের পূর্ব পাশে ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০ কাঠার একটি জমিতে ভবন নির্মাণ শুরু হলে মঈন তার দলবল নিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। এই জমির মালিক দুই জন। একজন মালিকের এক আত্মীয় ও ডেভেলপার কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, অনেক দিন ধরে জায়গাটির ওপর মঈনের নজর ছিল। সম্প্র্রতি ভবনের কাজ শুরু করতে গেলে বাধা দেওয়া হয়।
শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, চাঁদাবাজির মামলায় মঈন উদ্দিনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। মামলায় রিমান্ডে চাওয়া হবে কি না—এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
মঈনের চার সহযোগীর চার দিনের রিমান্ড :
সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালে চাঁদাবাজির মামলায় যুবদল কর্মী মঈন উদ্দিনের চার সহযোগীকে চার দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার এ আদেশ দেন ঢাকার মহানগর হাকিম আরিফুল ইসলাম। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রফিকুল ইসলাম জানান, রিমান্ডে যাওয়া আসামিরা হলেন ফারুক হোসেন সুমন, লিটন মিয়া, ফালান মিয়া ও মো. রুবেল। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। আসামিদের পক্ষে আইনজীবী কাজী আকরামুল হুদা সুমন রিমান্ড আবেদন বাতিল করে জামিন আবেদন করেন। শুনানি নিয়ে আদালত তাদের চার দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়।
গত শনিবার যুবদল কর্মী মঈন উদ্দিন ছাড়াও অচেনা সাত-আট জনের বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় চাঁদাবাজির মামলা করেন হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের ইনচার্জ আবু হানিফ। মামলার পর মঈনসহ সাত জনকে গ্রেফতার করে র্যাব। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানিয়েছেন, মঈনকে নড়াইলের কালিয়ার দাদনতলা গ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে চার জনকে সোমবার আদালতে হাজির করে সাত দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই ছাব্বির আহমেদ। আদালত প্রত্যেকের চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।