জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট সেবা বন্ধের কারণ জানিয়েছেন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ইমদাদুল হক মোল্লা। সরকারের নির্দেশেই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
রোববার (১২ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলকে এই জবানবন্দি দেন সাক্ষী ইমদাদুল। প্যানেলের অপর সদস্য হলেনৈ বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ইমদাদুল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে হত্যাযজ্ঞের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে তিন নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্য দেন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান।
অপটিমেক্স কমিউনিকেশন লিমিটেডের পরিচালক ইমদাদুল হক ২০২৩ সাল থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মহাখালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে আগুন লাগে। ওই দিন বিকেল ৪টা থেকে কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হয়। রাত ৯টা থেকে সারা দেশে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ইন্টারনেট।
জবানবন্দিতে ইমদাদুল বলেন, ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরাই শেষ স্তর। আমাদের ওপর আরও দুটি স্তর যথাক্রমে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি ও ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্টরিয়াল কোম্পানি (আইটিসি) রয়েছে। আইআইজি ব্যান্ডউইথ ক্রয় করে সরকারি প্রতিষ্ঠান সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি আইটিসি থেকে। ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হওয়ায় আইআইজির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আইটিসি থেকে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলে জানায় তারা। এরপর আমরা বুঝতে পারি যে, সরকারের সিদ্ধান্তে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২৩ জুলাই ঘটনাস্থল মহাখালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন পরিদর্শনে আসেন তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। সভাপতি হিসেবে আমি ও আরও অনেকেই উপস্থিত ছিলাম। আমরা প্রতিমন্ত্রীকে ইন্টারনেট সেবা চালু করার অনুরোধ জানাই। আজকের মধ্যেই চালু হবে বলে জানান তিনি। এরপর সবার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী।
সেদিন ডাটা সেন্টারে আগুন লাগার কারণে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন পলক। তবে তার ওই বক্তব্য রাজনৈতিক বলে মনে হয়েছে, ট্রাইব্যুনালকে এমনটা জানান ইমদাদুল হক।
তিনি আরও বলেন, আগুন লেগেছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে, ডাটা সেন্টারে নয়। তবে আগুনে ইন্টারনেট ট্রান্সমিশনে কিছু ফাইবার অপটিক ক্যাবল পুড়ে গিয়েছিল। ফলে ডাটা সেন্টারটি বন্ধ হলেও সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। কারণ সারা দেশে আরও ১৫ থেকে ১৬টি ডাটা সেন্টার রয়েছে।
জবানবন্দি শেষে ইমদাদুলকে জেরা করেন পলকের আইনজীবী লিটন আহমেদ। এ মামলায় পলাতক রয়েছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। তার হয়ে আইনি লড়াই করছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম।
তার দাবি, ইন্টারনেট বন্ধ বা সীমিত করার কোনো নির্দেশনা প্রদান করা হয়নি। এ ঘটনার সঙ্গে ইন্টারনেট বন্ধের অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং অগ্নিসংযোগ ও তার কেটে ফেলার কারণে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সেবার গতি কমে যেতে পারে, তবে এতে সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ হয়নি।
যুক্তি উপস্থাপন করে তিনি জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ ভবন (খাজা টাওয়ার নামে পরিচিত) এবং সংশ্লিষ্ট ডাটা সেন্টারগুলোতে অগ্নিসংযোগ ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে সেবায় বিঘ্ন ঘটে, যা স্বাভাবিকভাবে প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
আইনজীবী লিটন আহমেদ বলেন, উপস্থাপিত সাক্ষ্য ও ডিফেন্সের যুক্তি অনুযায়ী ইন্টারনেট স্লো বা সীমিত হওয়ার ঘটনা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আদালত বিষয়গুলো বিবেচনা করে ন্যায়সঙ্গত রায় প্রদান করবেন।