Image description

‘আমার ও আমার পরিবারের মূল অভিভাবক ছিল বড় আপা। সেই আপারে হারাইয়া আমি পাগলের মতো হইয়া গেছি। শেষবারের মতো দেখতে চাই আপার চেহারা। কারে ধরব, কারে কব, কী কইলে কে আইনা দেবে আপার মরদেহ, আমার মাথায় ধরে না।’

কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত নারী শ্রমিক দীপালি আক্তারের (৩৪) ছোট বোন লাইজু আক্তার (৩১)। গত বুধবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতে যে ভবনে দীপালি কর্মরত ছিলেন, সেখানে হামলা করে ইসরায়েলি বাহিনী। গুরুতর আহত অবস্থায় বৈরুতের রফিক হারিরি হাসপাতালে তাঁকে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

 

নিহত দীপালি আক্তারের বাড়ি ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পূর্ব চর শালেহপুর মুন্সিরচরে। লাইজু ও দীপালি পিঠাপিঠি হওয়ায় দুই বোনের মধ্যে ছিল গভীর সম্পর্ক। বড় বোনের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না লাইজু আক্তার। বোনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর। লাইজু বলেন, ‘আমার আপার লাশটা আমরা চাই। বড় বড় স্যাররা আইসা সবাই সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু কেউ কয় না, আপারে কবে আই না দেবে।’

আক্ষেপ করে লাইজু প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বড় বড় অফিসাররা বলে, “ফরিদপুরে আইসা আবেদন করো।” যারা আসে, তারা তো সাথে কইরা একটা আবেদন ফরম নিয়া আসতে পারে বাড়িতে। কিন্তু সেই দায়িত্ব কেউ বোধ করে না। শোক পালনের পাশাপাশি সব দায়দায়িত্ব যেন আমাদেরই।’ তিনি বলেন, রোববার (আজ) বোনের লাশ দেশে আনতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ফরিদপুর প্রবাসীকল্যাণ সেন্টারে আবেদন করবেন। সরকারের কাছে তাঁদের দাবি, তারা যেন বোনের লাশটি দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করে।

নিহত দীপালি আক্তার
নিহত দীপালি আক্তারছবি: সংগৃহীত

যোগাযোগ করলে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ষষ্ঠী পদ রায় প্রথম আলোকে বলেন, যেহেতু দীপালি আক্তার যুদ্ধে মারা গেছেন। এ জন্য লেবানন সরকারের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পাওয়া যাবে কি না, নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকার লাশ দেশে আনার পর বিনা মূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবার মাধ্যমে লাশ বাড়িতে পাঠানো এবং দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা দেবে। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ বাবদ তিন লাখ টাকা দেওয়া হবে।

ফরিদপুর প্রবাসীকল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক আশিক সিদ্দিকী গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা মরদেহ দেশে আনার জন্য ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছি। আজও (শনিবার) আমরা দূতাবাসের মাধ্যমে লেবাননে যোগাযোগ করেছি। আশা করি, দ্রুত দীপালির মরদেহ আমরা দেশে আনতে সক্ষম হব।’

গতকাল বিকেলে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুরাইয়া মমতাজ নিহত দীপালির বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের হাতে ১০ হাজার টাকা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একটি প্যাকেজ শুকনা খাবার তুলে দেন। অন্যদিকে একই সময়ে জেলার নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের লস্করদিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে সনাতন সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আপনারা জানেন, লেবাননে এখন একটি যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। আমাদের ফ্লাইট এখন সুবিধাজনক নয় যে আমরা এই মুহূর্তে আমাদের এই মেয়েটির (দীপালি) ডেড বডি আনতে পারব। আমরা সচেষ্ট আছি। খুব শিগগির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও লেবাননে আমাদের যে মিশন আছে, তারা কাজ করছে—কীভাবে নিরাপদে মেয়েটিকে (মরদেহ) দেশে ফিরিয়ে আনতে পারি।’