Image description

বাগেরহাটের হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) মাজারের দিঘিতে কুমির দেখার আগ্রহ নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেকে ঘাটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যদিও ঘাটে তখন কুমির দেখা যাচ্ছিল না, তবু দর্শনার্থীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি ভাইরাল ঘটনা কুমিরের মুখে একটি কুকুর ধরা পড়ার ভিডিও।

দর্শনার্থীদের কয়েকজন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা এমন ভিডিও দেখেছেন যেখানে দাবি করা হচ্ছে, কুকুরটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরের খাবার হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ আবার বলছেন, কুকুরটির পা বেঁধে পানিতে দেওয়া হয়েছিল। এসব পোস্টে লাখো ভিউ ও শত শত মন্তব্য দেখা গেছে।

তবে মাজারের খাদেম, নিরাপত্তাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ দুর্ঘটনা এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো তথ্যের অনেকটাই ভুল।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৮ এপ্রিল বিকেলে একটি অসুস্থ কুকুর মাজার এলাকায় কয়েকজনকে কামড় দেয়। স্থানীয়রা কুকুরটিকে তাড়াতে লাঠি ছুড়ে মারলে সেটি দৌড়ে নারীদের ঘাট থেকে প্রধান ঘাটের দিকে চলে যায়।

একপর্যায়ে মাজারের নিরাপত্তাকর্মী মো. ফোরকান হাওলাদারকে কুকুরটি আঁচড় দেয়। এসময় তিনি পা ঝাড়া দিলে কুকুরটি পানিতে পড়ে যায়। পরে দিঘিতে থাকা কুমিরটি কুকুরটিকে ধরে পানির নিচে নিয়ে যায়। ঘটনার এই অংশটুকুর ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

মাজারের নিরাপত্তাপ্রহরী মো. ফোরকান জানান, কুকুরটির আঁচড়ে আহত হয়ে তিনি বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন। তার ভাষায়, একটা পাগলা কুকুর কয়েকজনকে কামড়ায়। আমি ঘাটে লোকজনকে সতর্ক করছিলাম। কুকুরটা এসে আমাকে আঁচড় দেয়। পা ঝাড়া দিলে সেটি পানিতে পড়ে যায় তখন কুমির ধরে নিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী এক স্থানীয় তরুণ জানান, কুকুরটি অসুস্থ ছিল এবং কয়েকজনকে কামড়ানোর পাশাপাশি দুই-তিনটি মুরগিও মেরে ফেলে। সামনে যাকে পাচ্ছিল তাকেই তাড়া করছিল। এ সময় কয়েকজন দোকানি ও স্থানীয় ব্যক্তি কুকুরটিকে তাড়ালে সেটি দিঘির দিকে চলে যায় এবং পরে পানিতে পড়ে যায়।

মাজারের পাশে দোকানি বিনা আক্তার বলেন, কুকুরটি তার দোকানের সামনেও কয়েকজনকে আক্রমণ করে এবং একটি শিশুকেও কামড় দেয়। পরে কুকুরটি পানিতে পড়ে গেলে কুমির ধরে নিয়ে যায়। এ নিয়ে এখন সামাজিক মাধ্যমে নানা মিথ্যা গল্প ছড়ানো হচ্ছে।

স্থানীয় যুবক মেহেদী হাসান তপু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাজারের দিঘির কুমিরটির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলায় পরিচিতি ভিডিও করা কাছে গিয়ে খাওয়া গায়ে হাত দিয়ে আদর করা বিভিন্ন রকম ভিডিওতে দেখছেন আপনারা। আমার সঙ্গে কুমিরটি বন্ধুত্বের মতো আচরণ করে। তবে পূর্ণিমার সময় কুমিরটি ডিম দেওয়ায় ওই সময় মাদী কুমির কিছুটা হিংস্র হয়ে থাকে। তার মতে, কুকুরটি হঠাৎ কুমিরের সামনে পড়ে যাওয়ায় তখন কাউকে উদ্ধার করতে নামা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

তিনি আরও বলেন, আপনারা অনেকেই দেখেছেন, কুমিরটার সঙ্গে আমার একটা গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কাছাকাছি থাকায় ওর আচরণ কিছুটা বুঝতে পারি। এরপরেও আমি সব সময় সাবধানতা অবলম্বন করি। কারণ এটি বন্য প্রাণী, যে কোনো সময় আচরণ বদলে আক্রমণ করতে পারে। তাই আমি নিজেও সতর্ক থাকি এবং অন্যদেরও অযথা কাছে না যেতে বলি। ঘটনাটির সময় কেউ পানিতে নামলে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।

মাজারের খাদেমরা জানান, বর্তমানে দিঘিতে একটি মাত্র কুমির রয়েছে। এটি খানজাহান (রহ.)–এর সময়কার নয়। আগের কুমিরগুলো বিলুপ্তির পথে গেলে ২০০৫ সালে ভারত থেকে এনে নতুন কুমিরটি ছাড়া হয়।

খানজাহান আলী মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি দুর্ঘটনাজনিত হলেও সামাজিক মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। তিনি সবাইকে যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানান।

শীর্ষনিউজ