Image description

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বহির্বাণিজ্যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানি, বিশেষ করে নিত্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, ডলারসংকট এবং জাহাজে পণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানিতে লোকসানের মুখে পড়ছে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো। এর প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং উৎপাদন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের আমদানি কমে গেছে, যার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের নতুন ক্রয়াদেশ বা নতুন বিনিয়োগ থমকে আছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া এবং আমদানি খরচ বৃদ্ধির কারণে শিল্প খাতে ‘কস্ট-পুশ’ সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ করতে পারছে না বা এলসি খুলতে গড়িমসি করছে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় খাদ্যপণ্য ও কৃষিপণ্য আমদানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

 যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ডলারের উচ্চমূল্য বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস করতে বা নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য করছে। বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন পর্যালোচনায় জানা যায়, ইরান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে আমদানি কমে যাওয়ায় দেশের প্রকৃত জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। আমদানির পাশাপাশি রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে। সর্বশেষ মার্চ মাসের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কমে গেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রলম্বিত হলে গ্যাস, জ্বালানি ও কাঁচামাল সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন, বিশেষ করে পোশাক খাতে উৎপাদন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরান নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমানে ক্রয়াদেশ কমে গেছে, তার ওপর উৎপাদন খরচ বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এ সংকট আরও বাড়তে পারে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা এবং দ্রুত নীতিগত সহায়তা দেওয়া না হলে শিল্প খাত ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, যুদ্ধের কারণে নিত্যপণ্য ও শিল্প কাঁচামালের এলসি (ঋণপত্র) খোলার হার কমেছে। কারণ বড় ব্যবসায়ীরা সতর্কতামূলক অবস্থানে রয়েছেন। দেশের প্লাস্টিক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের অর্ধেকের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। ওই অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামালের দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন এ খাতের সঙ্গে জড়িত শিল্পগুলো। এতে প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বলেছেন, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাচ্ছে। কেউ কেউ দাম বাড়িয়ে উৎপাদন ব্যয় সমন্বয় করছেন।

শিল্পের কাঁচামালের পাশাপাশি নিত্যপণ্য আমদানিও ব্যাহত হচ্ছে। সূত্রগুলো জানায়, যুদ্ধের প্রভাবে ভোজ্য তেলের আমদানি কমেছে, যার ফলে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে লোকসান কমাতে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে পরিশোধনকারী মিল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আগামী রবিবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও লেবাননে ইসরায়েলের ভয়াবহ বোমা হামলার পর হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। ফলে যুদ্ধ নিয়ে অনিশ্চয়তা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এতে সামনের দিনগুলোতে শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্যপণ্য আমদানি আরও ব্যাহত হতে পারে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয় কমে যাওয়ারও প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। বাহরাইন, জর্ডান ও ইরাকের মতো দেশ থেকে প্রবাসী আয় কমতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধের ফলে কাজের পরিবেশ নষ্ট হওয়া, শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়া এবং কর্মীদের অনিয়মিত আয়ের কারণে দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয় কমে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে চাপ বাড়বে। ফলে ব্যালান্স অব পেমেন্টে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি টাকার মান আরও কমার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দেশের আমদানি-রপ্তানি, প্রবাসী আয়, টাকার অবমূল্যায়নে প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে চলতি হিসাবের ভারসাম্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। ভোগব্যয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে টান পড়তে পারে। জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এ বিষয়ে সরকারের কৌশল জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) আবদুর রহিম খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের বহির্বাণিজ্য বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে-এটি স্পষ্ট। এই প্রভাব মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। প্রয়োজনে সুবিধাভোগীদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের সুপারিশ অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।