Image description

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, গণভোট, গুম প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি দমনসহ গুরুত্বপূর্ণ ২০টি অধ্যাদেশ সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদের অনুমোদন না পাওয়ায় শনিবার (১১ এপ্রিল) থেকে তাদের বৈধতা হারাচ্ছে।  

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) পর্যন্ত জাতীয় সংসদ মোট ৯১টি বিল পাস করেছে। এর মধ্যে ৮৭টি বিলের মাধ্যমে ১১৩টি অধ্যাদেশের (কিছু আধ্যাদেশের সংশোধনীসহ) বৈধতা দেওয়া হয়েছে। আরও চারটি বিল পাস করে সাতটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে।   

তবে সরকার নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিল সংসদে উত্থাপন না করায় ১৩টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।  

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় গত ১২ মার্চ। সাংবিধানিক নিয়মে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশ অনুমোদনের সময়সীমা ৩০ দিন হিসেবে শুক্রবার (১০ এপ্রিল)।  

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির বৈঠকে যে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছিল, সরকার তা ভঙ্গ করেছে।   

তিনি বলেন, “কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিলটি কোনও পরিবর্তন ছাড়াই পাস করা হবে; কিন্তু তা সংশোধনীসহ গৃহীত হয়েছে।”   

শফিকুর আরও বলেন, “সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে সব অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হবে। কিন্তু ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়নি। ফলে অধ্যাদেশ গুলো শনিবার (১১ এপ্রিল) বাতিল হয়ে যাবে।”  

জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। বিরোধী দলের সঙ্গে পরামর্শ শেষে এগুলো পরে আনা হবে।”   

চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ১৬টি অধ্যাদেশ পরবর্তীকালে সংসদে উপস্থাপনের কথা সংসদকে জানান।   

সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হওয়া সাতটি অধ্যাদেশ হচ্ছে— ‘সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’, ‘জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তী বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ এবং ২০২৪–২০২৫ সময়ে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ।   

বাতিল হওয়া ১৩টি অধ্যাদেশ হচ্ছে— ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং এর সংশোধনী, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং এর সংশোধনী, ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’, ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৬’ এবং ‘তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’। 

অধ্যাদেশ অনুমোদনের শেষ দিনে জাতীয় সংসদ ২৪টি বিল পাস করে, যার বেশিরভাগ সর্বসম্মতভাবে পাস হয় এবং কয়েকটি বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে গৃহীত হয়।  

সর্বসম্মতভাবে পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে রয়েছে— ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের ও আহত ছাত্র-নাগরিকদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ২০২৬’, ‘নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’, ‘বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’, ‘ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’, ‘কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’ ও ‘রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’, ‘আমানত সুরক্ষা বিল, ২০২৬’, ‘আবগারি ও লবণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন বিল, ২০২৬’, ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও সুরক্ষা) বিল, ২০২৬’, ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল, ২০২৬’, ‘বিশ্ববিদ্যালয় আইন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘সাইবার নিরাপত্তা বিল, ২০২৬’, ‘গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘অর্থ বিল (অর্থবছর ২০২৫–২৬), ২০২৬’, ‘মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’। 

এদিকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিল, ২০২৬’ এবং ‘ব্যাংক রেজোলিউশন বিল, ২০২৬’ বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাস হয়। অপরদিকে বিরোধী সদস্যদের অনুপস্থিতিতে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল ২০২৬ সংশোধনীসহ পাস করা হয়।   

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রথম অধিবেশন ১৫ এপ্রিল সকাল ১১টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন।

ওয়াকআউটের পর বিরোধী দলের সদস্যরা, শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে, সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করেন। 

সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জননিরাপত্তা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাতিল হতে দেওয়া হয়েছে, ফলে সংসদ তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।  

শফিকুর রহমান বলেন, “অধ্যাদেশ বিষয়ক বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন বিরোধী দলের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা তিনি আস্থাভঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করেন।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি বিল অনুপযুক্তভাবে পাস করা হয়েছে।  

তিনি বলেন, “কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনে শেষ দিন মধ্যরাত পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু পুলিশ কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং গুম-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হয়নি।”   

নাহিদ অভিযোগ করেন, ‘ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখবে’—এমন পদক্ষেপগুলোই কেবল পাস করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, শেষ মুহূর্তে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিলে সংশোধনী এনে প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনৈতিক করার চেষ্টা করা হয়েছে।  

তিনি আরও অভিযোগ করেন, মন্ত্রীদের তুলনায় বিরোধী সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার সময় সীমিত রাখা হয়েছে, যা প্রক্রিয়াগত ভারসাম্য নষ্ট করেছে এবং স্পিকারের কাছে করা আবেদনগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “এভাবে একটি গণতান্ত্রিক সংসদ চলতে পারে না।”  

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের অভিযোগ, নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও বিরোধী দল বর্তমান সংসদ মেনে নিয়েছিল। এর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও তোলেন তিনি।