বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা বিভাগের এক সময়ের প্রতাপশালী কর্মকর্তা, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসান এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কাঠগড়ায়। তার বিরুদ্ধে আসা শতাধিক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এবং বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পক্ষে ‘ইমেজ হোয়াইটওয়াশ’ কার্যক্রম নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গুমের শিকার ও ভুক্তভোগীরা।
গুমের ভুক্তভোগীরা জানান, ‘ইটসমিস্বাধীন’ (ItsMeSwadhin) এর মতো ফেসবুক প্রোফাইল ও সুসংগঠিত একটি নেটওয়ার্ক ‘হাফ-ট্রুথ’ (অর্ধসত্য) কৌশলে জিয়াউল আহসানের অপরাধ আড়ালের চেষ্টা চালাচ্ছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
গুম ভিকটিম প্রকৌশলী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, ‘জিয়াউল আহসানের ভাতিজা পরিচয় দিয়ে ‘ইটসমিস্বাধীন’ ফেসবুক আইডি থেকে গত কয়েক মাসে একাধিক পোস্ট দেওয়া হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে একই আইডি থেকে ‘নো বোট-নো ভোট’ প্রচারও করা হয়। শেখ ফারদিন এহসান স্বাধীন নামের এ তরুণ জিয়াউল আহসানকে চাচা পরিচয় দিয়ে তার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। সে নিজেকে ছাত্রলীগ কর্মীও দাবি করে। ‘দিস ইজ স্বাধীন’ (this_is_swadhin) নামে ইনস্টাগ্রামেও সে এ ইস্যুতে সরব।’
র্যাবের কসাই জিয়াউল আহসানের অপরাধের খতিয়ান
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দাখিলকৃত প্রসিকিউশনের চার্জশিট ও তদন্ত প্রতিবেদনে র্যাবের কসাই হিসেবে পরিচিত জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে লোমহর্ষক অনেক তথ্য উঠে এসেছে। ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুরের পূবাইলে তার সরাসরি কমান্ডে সজলসহ তিনজনকে নির্মমভাবে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে এই অপারেশন তদারকি করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এছাড়া ২০১০-২০১৩ সালের মধ্যে তথাকথিত ‘জলদস্যু দমন’-এর নামে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলা এলাকায় নজরুল ও মল্লিকসহ অন্তত ৫০ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে পেশ করা হয়েছে। ২০১৪ সালের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার অভিযুক্ত প্রধান ঘাতক মেজর আরিফ হোসেনও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন যে, তিনি তৎকালীন র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার প্রধান জিয়াউল আহসানের নির্দেশেই ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন।
এনটিএমসি : রাষ্ট্রীয় সংস্থা যখন
নজরদারির হাতিয়ার
জিয়াউল আহসানের সবচেয়ে বড় ক্ষমতার উৎস ছিল এনটিএমসি। তার নেতৃত্বে এ রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে একটি ব্যক্তিগত নজরদারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয়েছিল। বিরোধীদলীয় নেতা, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত ফোনকল রেকর্ড ফাঁস এবং হোয়াটসঅ্যাপ-মেসেঞ্জার হ্যাক করার মূল কারিগর ছিলেন তিনি। বর্তমান তদন্তে এনটিএমসির সার্ভার থেকে এমন অনেক অডিও ক্লিপ ও ডেটা উদ্ধার করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক নেতাদের ব্ল্যাকমেইল করার জন্য ব্যবহৃত হতো। চব্বিশের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ‘আয়নাঘর’ থেকে মুক্তি পাওয়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজমি এবং ব্যারিস্টার আরমানের মতো ভুক্তভোগীরাও জিয়াউল আহসানের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন। তারা বর্ণনা করেছেন কীভাবে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বছরের পর বছর তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।
ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা ও ‘অর্ধসত্য’ কৌশল
ভুক্তভোগীরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে জিয়াউল আহসানের মতো অপরাধীদের ইমেজ ‘হোয়াইটওয়াশ’ করার জন্য একটি সুসংগঠিত ডিজিটাল সেল কাজ করছে। ‘ইটসমিস্বাধীন’ এর মতো প্রোফাইলগুলো থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে, ‘আয়নাঘর’ কেবল একটি কাল্পনিক নাটক। তারা তদন্তাধীন বিষয়ের দোহাই দিয়ে ভুক্তভোগীদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছে, যা সরাসরি তথ্য বিকৃতি এবং নির্যাতিতদের প্রতি চরম অবমাননা। এসব প্রোপাগান্ডামূলক আইডি থেকে দাবি করা হয়, জিয়াউল আহসান না থাকলে বাংলাদেশ ‘তালেবানি রাষ্ট্র’ হয়ে যেত। হলি আর্টিজান অপারেশনের সাফল্যের দোহাই দিয়ে তার পরবর্তী এক দশকের অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বট ও ফেক প্রোফাইলের মাধ্যমে একই বয়ান বারবার শেয়ার করে কৃত্রিম জনমত তৈরির এ প্রক্রিয়াকে বিশেষজ্ঞরা ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ নেটওয়ার্কের মূল লক্ষ্য হলো পারিবারিক আবেগ ব্যবহার করে আইনি অভিযোগগুলোকে হালকা করা। পরিবারের আবেগ একটি মানবিক সত্য হলেও সেটিকে ব্যবহার করে শতাধিক গুম ও খুনের অভিযোগকে আড়াল করার চেষ্টা মূলত একটি ডিজিটাল অপচেষ্টা। অনেক ক্ষেত্রে তার হার্টের সমস্যা বা জেলখানায় সুবিধা না পাওয়ার বিষয়টিকে হাইলাইট করে তাকে ‘অসহায় বৃদ্ধ’ হিসেবেও চিত্রায়িত করা হয়।
বিচারের অগ্রগতি ও বিশেষজ্ঞ মত
চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কুখ্যাত জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেছেন। আদালত তার অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আনীত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
এসব ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ স্কলার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, ‘বিচার প্রক্রিয়া আইনানুযায়ী পরিচালিত হয়। প্রসিকিউশন ও বিচারকবৃন্দ সন্দেহাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো অভিযুক্তকে সাজা দেওয়া বা নিরপরাধ সাব্যস্ত করবেন। রাজপথের অযাচিত চোখ রাঙানি, গণমাধ্যমের অন্যায্য সমালোচনা বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রচারিত দুরভিসন্ধিমূলক প্রোপাগান্ডা সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী বিচার প্রক্রিয়া প্রভাবিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘জিয়াউল আহসানের অপরাধ প্রমাণ করতে এখন পর্যন্ত হওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের সংশ্লিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ বিবেচনায় নিলেই ন্যায়বিচার করা সম্ভব। যারা গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন তাদের ন্যায়বিচার ছাড়া অন্য কোনো প্রত্যাশা নেই, যেটা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বিচারবিভাগীয় দায়িত্ব।’