কাজকর্ম শেষ করে সন্ধ্যার দিকে ভালোমতো বাজার সদাই করা, কিংবা একটু রাতের দিকে মার্কেটে গিয়ে দরকারি বা পছন্দের কোনো জিনিসপত্র কেনাকাটা—এই অভ্যাস যাদের রয়েছে, তাদের জন্য একটু মুশকিল। সন্ধ্যা ছয়টার পর থেকে এখন ইমারজেন্সি ঘরানার কিছু (কাঁচাবাজার, খাবারের দোকান ও ওষুধের দোকান ইত্যাদি) দোকানপাট ছাড়া বাকি সব বন্ধ। আটটার পরে সবকিছু বন্ধ করার মতো নির্দেশনা অতীতেও হয়েছে। বৈশ্বিক তেল সংকট প্রেক্ষিতে আরও দুই ঘণ্টা এগিয়ে আনার ব্যাপারটি নতুন অভিজ্ঞতা হতে চলেছে দেশবাসীর জন্য। প্রশ্ন আসতে পারে, এত তাড়াতাড়ি দোকানপাট গোটানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্য দেশগুলোয় কেমন অবস্থা।
ছয়টার মধ্যে ‘সবকিছু’ বন্ধ হয়ে যাওয়া আমাদের অনেকের জন্যই বেশ ‘ধাক্কার’ মতো একটা পরিবর্তন হলেও, পশ্চিমা দেশগুলোর ক্ষেত্রে বলতে গেলে এটা তেমন নতুন কিছু নয়। জেনে অবাক হবেন, পশ্চিমা অনেক দেশেই সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে এমনিতেই জরুরি কিছু সেবা ছাড়া দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, সেখানে দাপ্তরিক সময় ৮-৪ বা ৯-৫ বেশ ভালোভাবেই অনুসরণ করা হয়। অভ্যাসগতভাবে, তাদের রাতের খাবারের সময়টাও আমাদের তুলনায় বেশ তাড়াতাড়ি। মোটা দাগে বলা যায়, পশ্চিমা দেশগুলোর অনেক জায়গাতেই সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে ছোটখাট দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়।
কোরা বা রেডিটের মতো বেশ কিছু সাইটে ব্যবহারকারীদের প্রশ্নোত্তরে জানা গেল, ছোট শহর বা এলাকার ক্ষেত্রে সন্ধ্যার মধ্যে দোকানপাট গুটিয়ে ফেলাটাই সচরাচর ঘটে থাকে। কর্মজীবী মানুষজন হয় খুব সকালে, নয়তো অফিস টাইমের পরপরই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে ফেলেন। এক্ষেত্রে দোকানপাটের পরিসর এবং পণ্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। বিশাল কোনো চেইনশপ হয়তো অনেকটা সময়ই খোলা থাকে, অন্যদিকে ছোটখাট বুটিক শপগুলো হয়তো বিকেল গড়াতে না গড়াতেই সব বন্ধ। সন্ধ্যা থেকে রাত দোকান খোলা রাখতে বাড়তি কোনো জনবল বা আর কিছু সাশ্রয় করাই এক্ষেত্রে মুখ্য, কারণ বিকেলের পর ছোট শহরে বা ছোট দোকানে সেভাবে ক্রেতারা আসেন না।
বড় শহর বা দোকানপাটের ক্ষেত্রে অবশ্য বিষয়টি ভিন্ন। ইউরোপে এমনিতেই দোকানপাট একটু তাড়াতাড়িই বন্ধ হয়। আমেরিকায় একেক জায়গায় একেক রকম চল। তুলনামূলকভাবে বলা চলে, নর্দার্ন ইউরোপিয়ান বনাম আমেরিকান অঞ্চলে দোকানপাট বন্ধের চল ভিন্ন। ইউরোপের ক্ষেত্রে হয়তো বড় শহর বা দোকান বন্ধের সময় রাত ৯টা বা দশটা নাগাদ। সেখানে আমেরিকার শহরতলীর দিকে রাত দশটাতেও দোকানপাট খোলা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের মতো, মিসরেও ঘোষণা এসেছে দোকানপাট দ্রুত বন্ধ করার জন্য। তবে যেসব দোকানপাট বা ব্যবসা সন্ধ্যার পর জমে ওঠে, তাদের জন্য বিষয়টি উদ্বেগের। পর্যটনের জন্য কায়রো বিখ্যাত, ভ্রমণার্থীদের আগ্রহও থাকে কায়রোর নাইট লাইফের জন্য। সেখানে এমন ঘোষণা অনেকের জন্যই পরিস্থিতি কঠিন করে তুলেছে। কায়রোর এক ঐতিহ্যবাহী এলাকা সায়্যিদা জেয়নাবের একটি ক্যাফের মালিক সালাহ তার দোকানের ৪০ শতাংশ লোকবল কমিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। তার ক্যাফে খোলা থাকত চব্বিশ ঘণ্টা, লোকজন থাকত তিন শিফটে, আর সবচেয়ে জমজমাট সময়ই হচ্ছে রাতের বেলা। এখন সেই রাতের শিফট পুরোপুরি বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে বলে লোক ছাঁটাই করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। এলাকাটিতে দর্শনার্থীদের জন্য বড় আকর্ষণ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী রেস্তোঁরা, সেগুলোও এই ক্যাফের মতো ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় এশীয় দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের সংকট একটু বেশিই ধাক্কার। এর প্রভাবে বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্য আরও এশীয় দেশগুলোও জরুরি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। পাকিস্তান সারা সপ্তাহের কাজের সময় কমিয়ে এনেছে, সরকারি কর্মচারীদের জ্বালানি ভাতা কমিয়ে দিয়েছে এবং অধিকাংশ সরকারি যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে নিয়েছে। শ্রীলঙ্কা জ্বালানি ব্যবহার কমাতে প্রতি সপ্তাহে সরকারি ছুটি বাড়িয়েছে, একই সঙ্গে রেশনিং আরও কঠোর করা হয়েছে। থাইল্যান্ড সরকারি কর্মকর্তাদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে (হোম অফিস) এবং এসির তাপমাত্রা বাড়িয়ে ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে। ফিলিপাইন সরকারি খাতের কিছু অংশে কর্মসপ্তাহ সংক্ষিপ্ত করেছে এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বিদ্যুৎ বাজারেও হস্তক্ষেপ করেছে।