Image description

দেশের সবকটি সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের পর, স্থানীয় সরকারের বাকি নির্বাচন কবে হবে এ নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তবে প্রশাসক নিয়োগের কারণে এ নির্বাচন নিয়ে সরকারের যে আপাতত আগ্রহ নেই জনমনে এই ধারণা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে চায়ের দোকান, হাট-বাজারসহ সর্বত্র এখন আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেছে উপজেলা ও ইউপি নির্বাচন।

জুলাই বিপ্লবের পর উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে দীর্ঘদিন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। জোড়াতালি দিয়ে চলছে পরিষদের কাজ। নির্বাচন হলে কোনটি আগে এবং কোনটি পরে হবে এসব নিয়ে সাধারণ জনগণের মতো সরকারও রয়েছে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে। স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ইসি সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনানুষ্ঠানিক এক সভায় মৌখিকভাবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এই নির্বাচনটি ঈদুল ফিতরের পর এবং ঈদুল আজহার আগে কোনো এক সময়ে করার চিন্তা করা হয়। সেভাবেই সংশ্লিষ্ট শাখাতে এর কার্যক্রম নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়। কিন্তু এর কয়েক দিন পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের জানান, আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। মন্ত্রীর সাম্প্রতিক দুটি পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে নতুন করে সংশয়ে পড়ে যায় স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা। তারাও ধারণা করতে পারছেন নাÑ সরকার কোন নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় স্তরের যাত্রা শুরু করতে চাইছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি দেশের সব সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছে। তবে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে নির্বাচনের বিকল্প নেই—এ বিষয়েও সরকারের ভেতরে আলোচনা চলছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। স্থানীয় সরকার আইনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন সংক্রান্ত বিধান পরিবর্তন বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে সংসদে সিদ্ধান্ত হলে উপজেলা নির্বাচন আয়োজনের পথ আরো সহজ হবে।

জানা গেছে, উপজেলা নির্বাচন দিয়ে মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক শক্তির বাস্তব অবস্থা যাচাই করতে পারে সরকার। এ বিষয়ে সবুজ সংকেত মিললে নির্বাচন কমিশনকে উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হতে পারে। এ শাখার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় আগে উপজেলা নির্বাচন করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। পরে এ নিয়ে নতুন করে কোনো অগ্রগতি জানানো হয়নি। আমরা সরকারের নির্দেশনা পেলেই এ কাজে নেমে পড়ব।

মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের মতো উপজেলা পরিষদে নতুন করে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেই। নির্বাচনের মাধ্যমেই এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পথে এগুবে নাকি প্রশাসক দিয়ে আপাতত চালাবে তা স্পষ্ট হতে আরো কিছু সময় লাগতে পারে।

অন্যদিকে, পৌরসভাগুলোতেও প্রশাসক নিয়োগ করা হবেÑ এমন আভাস সরকার থেকে পায়নি মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে আমার দেশকে জানান, বর্তমানে সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনও এবং জেলা প্রশাসনের ডিডি (স্থানীয় সরকার) প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন এবং আপাতত তারাই এ দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন।

পৌরসভার দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব মো. খলিলুর রহমান আমার দেশকে বলেন, বর্ষা মৌসুমকে এড়িয়ে পৌরসভা নির্বাচন করার চিন্তা রয়েছে সরকারের। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। ইতোমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ, মেয়াদকালীন ও মামলা সংক্রান্ত পৌরসভার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সরকার যখন চাইবে, তখন নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে এ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে অনুরোধ জানানো হবে। তবে, আপাতত পৌরসভাতে কোনো প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না; বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্তরা দেখভাল করবেন।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, এখন পর্যন্ত উপজেলা ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেই। সরকার এবং মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে আমরা প্রশাসক যেগুলোতে দিয়েছি এবং যেগুলোতে ইউএনও ও এসিল্যান্ড প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারাই চালিয়ে যাবেন। আমরা খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে দেব। সেই নির্বাচনে যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে, তারাই এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিনিধিত্ব করবে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে সচল রাখতে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তার মতে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে দেওয়া হলে তৃণমূলের বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝা সহজ হবে।

সর্বশেষ ২০২২ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই হিসেবে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে অনেক ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হবে। আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে চলতি বছরের মধ্যেই ইউপি নির্বাচন শেষ করতে হবে।

প্রশাসক দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা মূলত একটি সাময়িক ব্যবস্থা বলে মনে করেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। আমার দেশকে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে তৃণমূলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তিনি আরো জানান, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় তাদের জবাবদিহিতা থাকে। ফলে জনগণ প্রত্যাশিত সেবা পাওয়ার সুযোগ বেশি থাকে। এছাড়া উপজেলা কিংবা পৌরসভা বা স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে নতুন করে কোনো তাগিদপত্র পাননি বলেও জানান এই নির্বাচন কমিশনার।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার আমার দেশকে বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রাণ হলো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। প্রশাসক দিয়ে কিছুদিন কাজ চালানো সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি কার্যকর সমাধান নয়। তিনি জানান, নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সক্রিয় না থাকলে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা, জনসেবা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।