দেশে টিকার সংকট চলছে। কেন্দ্রীয় গুদামে ১০টি রোগের টিকার মজুত শূন্যে নেমেছে। এদিকে চলতি মাসে হামে দেশে ৪১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ও সরকারি হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, টিকা কেনার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেওয়ায় মজুত শূন্যে নেমে এসেছে। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে টিকার স্বল্পতা ও জনবলঘাটতির কারণে শিশু ও মায়েরা ঠিকমতো টিকা পাচ্ছে না। ফলে শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। শিশুদের মধ্যে অন্য রোগও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ টিকা কর্মসূচিতে সফল দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নিয়মিত টিকাদান এবং বিভিন্ন ধরনের টিকা কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশ পোলিও এবং ধনুষ্টংকার নির্মূলে সফল হয়েছে। হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। হামও অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ছিল। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হাম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল; কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, গাফিলতির কারণে একটি সফল কর্মসূচি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
দেশে হামের সংক্রমণ বেড়েছে স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, আট বছর আগে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয়নি।
টিকার সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভি বাংলাদেশকে টিকা কেনায় আর্থিক সহায়তা দেয়। গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার নিজাম উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, জনবলঘাটতি, টিকার সরবরাহ ও লজিস্টিক সংকটের পাশাপাশি নিয়মিত টিকা কর্মসূচিতে নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। শহরাঞ্চলে সব জায়গায় টিকা সমানভাবে দেওয়া হয় না। এ ছাড়া কোভিড–পরবর্তী সময়ে ড্রপ আউটের কারণে অনেক শিশু প্রথম ডোজ টিকা পেলেও দ্বিতীয় ডোজ পায়নি। এসব কারণে টিকা না পাওয়া মোট শিশু সংখ্যায় অনেক হয়েছে। এরাই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশগত কিছু ঝুঁকি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
দেশে হামের সংক্রমণ বেড়েছে স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, আট বছর আগে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। যথাসময়ে টিকা সংগ্রহ করে তা দেওয়া শুরু করব।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শিশুদের হামের চিকিৎসার জন্য সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মানিকগঞ্জ এবং উত্তরাঞ্চলে শিশুদের হাম মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
১০ রোগের ৬ টিকার সংকট
দেশে দুইভাবে টিকা দেওয়া হয়। একটি হচ্ছে নিয়মিত টিকা কর্মসূচি। এটি সারা বছর ধরে চলে। এই টিকা দেওয়া হয় মাঠপর্যায়ে। টিকা দেন মাঠকর্মী বা স্বাস্থ্যকর্মীরা। কোন বয়সে কোন টিকা দেওয়া হবে, তা নির্দিষ্ট করা আছে।
এই নিয়মিত টিকার পাশাপাশি টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়। একটি নির্দিষ্ট বয়সী দেশের সব শিশুকে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে টিকার আওতায় আনা হয়। এই ক্যাম্পেইনের আগে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচার–প্রচারণা চালানো হয়। এর পাশাপাশি জাতীয়ভাবে ভিটামিন এ–এর ক্যাম্পেইনও করা হয়। এসব ক্যাম্পেইনে দাতা সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলো যুক্ত হয়। নিয়মিত টিকাদানের সময় বাদ পড়া শিশুরা ক্যাম্পেইনের সময় টিকা নেয়।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইপিআইয়ের মাধ্যমে দেশে ১২টি রোগ প্রতিরোধে ৯টি টিকা দেওয়া হয়। বিভিন্ন বয়সী শিশুদের দেওয়া হয় সাতটি টিকা। বিসিজি টিকা দেওয়া হয় যক্ষ্মা প্রতিরোধে; পেন্টা টিকা দেওয়া হয় ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস, ধনুষ্টংকার, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ–বি ও হেপাটাইটিস–বি প্রতিরোধে; ওপিভি টিকা দেওয়া হয় পোলিও প্রতিরোধে; আইপিভি দেওয়া হয় পোলিও প্রতিরোধে; নিউমোনিয়া প্রতিরোধে দেওয়া হয় পিসিভি টিকা; হাম ও রুবেলা রোগ প্রতিরোধে এমআর টিকা এবং টিসিভি টিকা দেওয়া হয় টাইফয়েড প্রতিরোধে।
ইপিআই কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি—এই ছয়টি টিকার মজুত শূন্য। আইপিভি ও টিসিভি চলবে জুন পর্যন্ত এবং এইচপিভির মজুত আছে ডিসেম্বর পর্যন্ত।
দুটি টিকা দেওয়া হয় নারীদের। এর মধ্যে ১০ বছরের বেশি বয়সী কিশোরীদের এইচপিভি টিকা দেওয়া হয় জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে এবং প্রজননক্ষম ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া প্রতিরোধে দেওয়া হয় টিডি নামের টিকা।
ইপিআই কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি—এই ছয়টি টিকার মজুত শূন্য। আইপিভি ও টিসিভি চলবে জুন পর্যন্ত এবং এইচপিভির মজুত আছে ডিসেম্বর পর্যন্ত।
তবে মাঠপর্যায়ে কোনো কোনো টিকার ঘাটতি আছে বলে ইপিআই এবং দাতা সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, হামে এত শিশুর মৃত্যু খুবই দুঃখজনক। এ জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই দায়ী। কেন টিকা ফুরাল, কেন শিশুরা মারা গেল—এর অনুসন্ধান, তদন্ত হওয়া জরুরি। এটা চলতে দেওয়া যায় না।
কেন টিকা নেই
দাতা সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে টিকা কেনা হতো স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচিতে (এইচপিএনএসপি) থাকা অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে। ওপির লাইন ডিরেক্টর ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ে টিকা কিনতে পারতেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি তথা ওপি–ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এরপর থেকে নতুন প্রকল্প–দলিল তৈরি, প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়—সবকিছুতে বিলম্ব হচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, টিকা কেনার ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) বড় ভূমিকা থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছুদিন ডিজির পদ খালি ছিল। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ডিজি ছিলেন অধ্যাপক আবু জাফর। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন ডিজির পদে বসেছেন অধ্যাপক প্রভাত কুমার বিশ্বাস। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই হামের টিকা–সংকটের পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহারিয়ার সাজ্জাদ গতকাল রোববার এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রণালয় যদি দ্রুত টাকা ছাড়ের ব্যবস্থা করে, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।
জনবল–সংকট
একদিকে টিকার সংকট, অন্যদিকে রয়েছে জনবল–সংকট। ইপিআইয়ের কর্মকর্তারা বলেন, দেশের ২৭টি জেলায় স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকি ৩৭ জেলায় জনবল–সংকট প্রকট। এই ৩৭ জেলায় মাঠপর্যায়ে ৪৫ শতাংশ কর্মী নেই। মাঠপর্যায়ের এই কর্মীরা ইউনিয়নের নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের টিকাকেন্দ্রে টিকা দেন। সারা দেশে এখন টিকাকেন্দ্র আছে প্রায় দেড় লাখ।
বর্তমান সংকটের আরেকটি কারণ কর্মীদের মধ্যে কিছু অসন্তোষ। যেমন পোর্টাররা ৯ মাস ধরে বেতন পান না। ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহারিয়ার সাজ্জাদ বলেন, সারা দেশে ‘পোর্টার’ আছেন ১ হাজার ৩২৬ জন। তাঁরা উপজেলা সদর থেকে বিশেষ পাত্রে করে প্রতিদিন টিকা পৌঁছে দেন টিকাকেন্দ্রে।
উদাহরণ আরও আছে, ২০২৫ সালে এক বছরেই সারা দেশের স্বাস্থ্য সহকারীরা তিন দফায় কর্মবিরতিতে যান। এ সময়ে সারা দেশে টিকা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, কোনো এলাকায় টিকা নেই, সেখানে হয়তো জনবল আছে। আবার কোথাও জনবল আছে, টিকা নেই। কোনো কোনো জায়গায় দুটিই নেই।
বেশি মৃত্যুর খবর আসছে
শনিবার দুপুর থেকে গতকাল রোববার দুপুর পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত আরও দুটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এই হাসপাতালে চলতি মাসে হামে পাঁচটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ মাসে হামে আক্রান্ত ১৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অবশ্য গত পরশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিনজনের কথা বলেছিল। একই সময়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে মৃত্যু হয়েছে তিনটি শিশুর।
শরীয়তপুরে হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু হয়েছে রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশন মার্কেট হাসপাতালে। এ নিয়ে এ বছর এবং এই মাসে ৪১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে হামে এত বেশি মৃত্যুর ঘটনা দেশে ঘটেনি।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, হামে এত শিশুর মৃত্যু খুবই দুঃখজনক। এ জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই দায়ী। কেন টিকা ফুরাল, কেন শিশুরা মারা গেল—এর অনুসন্ধান, তদন্ত হওয়া জরুরি। এটা চলতে দেওয়া যায় না।