‘আমার ছেলেকে দালাল মেরে ফেলেছে। তোমরা আমার পোলারে আইন্না দেও। আমি আমার পোলারে দেখতাম চাই। তার লগে কতা কইতাম চাই। এভাবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া গ্রামের নাঈম মিয়ার মা আকি বেগম।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাতে গ্রিসের কোস্টগার্ডের দেওয়া বিবৃতিতে মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর খবর শোনার পর রোববার (২৯ মার্চ) নাঈম মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
নাঈমের বাবা দুলন মিয়া বলেন, ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজুল ইসলামের সঙ্গে গ্রিসে পাঠানোর জন্য ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে জানুয়ারি মাসে লিবিয়া যায় আমার ছেলে। সেখানে যাওয়ার কিছুদিন পর গ্রিসের গেম দেওয়ার কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে দালাল। তার দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করার পরও গ্রিসে পাঠাতে টালবাহানা করে। অবশেষে ২১ মার্চ গেম দেওয়া হয়। কথা ছিল গেম দেওয়ার আগে আমাদেরকে জানানো হবে। কিন্তু আমাদের জানানো হয়নি। শনিবার জানতে পারি সাগরে আমার ছেলে মারা গেছে। তার লাশ সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়েছে।
একই গ্রামের আরেব যুবক ইজাজুল হক রেজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজন ও প্রতিবেশীরা ইজাজুল হকের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
ইজাজুল হক বাবা সামছুল হক বলেন, ছাতক উপজেলার শক্তিগাঁও গ্রামের দালাল দুলাল মিয়ার মাধ্যমে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে ৩ মাস আগে লিবিয়া যায় আমার ছেলে। সব টাকা পরিশোধ করা হলেও গ্রিসে পাঠাতে দেরি করতে থাকে দালাল। আমার ছেলে ঈদের আগে ভয়েস বার্তায় জানায়, ‘দালাল আমাদের খাওয়াদাওয়া দিচ্ছে না। বড় কষ্টে আছি। দোয়া করিও’। এরপর আমার ছেলের সঙ্গে আর কথা হয়নি। এখনও শুনি আমার ছেলে মারা গেছে।
চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে দালালচক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের ফাঁদে দেশের হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। অকালে প্রাণ হারাচ্ছে শত শত যুবক। দ্রুত সব দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
জেলা প্রশাসকের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরকত উল্লাহ। তিনি বলেন, গ্রিস যাওয়ার পথে এ উপজেলার ৫ জন মারা গেছেন। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ভূমধ্যসাগরে যারা মারা গেছেন তারা বৈধপথে না যাওয়ায় তাদের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করছি। যাদেরকে টাকা দেওয়া হয়েছিল তাদের তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।