প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে (নগদ, বিকাশ) পাঠানোর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে প্রতারণা ও ডিজিটাল চুরির শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। একাধিক ভুক্তভোগীদের দাবি— যে অফিসিয়াল নম্বর বা ‘হেডার’ থেকে উপবৃত্তির টাকা আসার কনফার্মেশন মেসেজ পাঠানো হয়েছে ঠিক সেই একই নম্বর থেকে কল করে ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা’ পরিচয়ে ওটিপি চাওয়া হয়েছে এবং ওই নম্বরেই ক্যাশআউট করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন (স্মারক নং: এইচএসপি/মাঠ পর্যায়ে যোগাযোগ/০৪/২০২০/১৯) পর্যালোচনায় দেখা যায়, উপবৃত্তি প্রদান ও তথ্য যাচাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং এটি ‘HSP-MIS’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে নিয়ন্ত্রিত হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ব্যক্তিগতভাবে কোনো শিক্ষার্থীর পিন বা ওটিপি চাওয়ার কোনো প্রশাসনিক সুযোগ বা নিয়ম নেই।
তবে দ্য ডিসেন্ট সম্প্রতি অফিসিয়াল নম্বর ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একাধিক অভিযোগ জানতে পেরেছে। মোবাইল নম্বরটি উপবৃত্তির টাকা পাঠানোর জন্য অফিশিয়ালি ব্যবহার করা হয় বলে নিশ্চিত হয়েছে দ্য ডিসেন্ট।
উপবৃত্তির টাকা নিয়ে জালিয়াতির শিকার একজন ভুক্তভোগী বাগেরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যলয় এর অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর নাম নোমান শেখ। গত ২৬ জানুয়ারি 01757889996 নম্বর থেকে উপবৃত্তির টাকা আসে নোমানের বাবা ফয়সাল শেখের নগদ একাউন্টে।
মুঠোফোনে টাকা পাঠানোর কনফার্মেশন মেসেজটি ছিল এরকম- “NAGAD 26-01-2026 05:16PM Cash In Received. Amount: Tk 2600.00 Uddokta: 01757889996 TxnID: 74VHIJHS Balance: 2649.00 26/01/2026 17:16”.
ফয়সাল শেখ জানান, গত পহেলা ফেব্রুয়ারি তার মুঠোফোনে উক্ত নম্বর থেকে একটি কল আসে। কল করে বলা হয়, “আমি শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে বলছি, এটা কি বাগেরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যলয় এর অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নোমান শেখ এর নাম্বার?”
ফয়সাল শেখ নিজেকে নোমানের বাবা জানালে ওই প্রান্ত থেকে বলা হয়, “উপবৃত্তির একাউন্ট আপডেট করতে হবে আপনার নগদ একাউন্ট এর পিন নাম্বার বলুন।”
ফয়সাল শেখ পিন নাম্বার দিতে রাজি না হলে ওই প্রান্ত থেকে ওটিপি দিতে বলা হয়। ফয়সাল শেখ ওটিপি বুঝেন না জানালে অপর পাশ থেকে বলা হয় যে, একটা মেসেজ যাবে ওটা পড়ে শোনান।
ফয়সাল শেখের মুঠোফোনে “01-02-2026 02:29PM NEVER share your OTP or PIN with anyone. Nagad will never ask for these. Your OTP for Nagad ECOM payment is 670079 Validity: 2 minutes. Helpline: 16167” মেসেজটি পাঠানো হয়।
ফয়সাল শেখ মেসেজটি পড়ে শোনালে তার একাউন্ট থেকে সঙ্গে সঙ্গে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
নগদ অ্যাপে ফয়সাল শেখের একাউন্টে লগইন করে লেনদেন সেকশন যাচাই করলে প্রমাণ মেলে যে নম্বার থেকে উপবৃত্তির টাকা ক্যাশ ইন করা হয়েছিল সেই নম্বর এবং ক্যাশআউট নম্বর একই।
বাগেরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এর সহঃ শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) শেখ শাহীন হাসান জানান, তার বোনও একই ধরণের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, “অফিস একাউন্ট আপডেট করার জন্য কোন শিক্ষার্থীর নগদ পিন বা ওটিপি চাইতে পারে না। তাছাড়া আমাদের কাছেও একাউন্ট আপডেট এর কোন নোটিশ আসেনি। এই ধরণের প্রতারণা আমার বোনের সাথেও ঘটেছে। আমার বোনের কাছ থেকেও একইভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র।”
যে নম্বর থেকে ফোন করে ওটিপি চাওয়া হয় সেটিতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কল রিসিভ হয়নি।
এই ব্যাপারে জানতে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের স্কিম পরিচালক (যুগ্মসচিব) মোহাম্মদ আসাদুল হক এর সাথে যোগাযোগ করার জন্য চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল মজিদ এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “এটা ফ্রড, এমন কোন ফোন আসলে অফিসিয়ালি যায় না।” তবে যে নম্বর থেকে ফোন করে টাকা চাওয়া হয়েছে সেটি উপবৃত্তির টাকা পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত অফিশিয়াল নম্বর বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।
পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের জুনিয়র অফিসার জিন্নাহ এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও এটিকে ফ্রড বলে দাবি করেন। তবে ওই নম্বরটি উপবৃত্তির টাকা পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত হয় বলে নিশ্চিত করেছেন এই কর্মকর্তা।
তিনি দ্য ডিসেন্ট এর সাথে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের ডকুমেন্টেশন অফিসার ইমদাদুর রহমান তালুকদারের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেন।
এ নিয়ে ডকুমেন্টেশন অফিসার ইমদাদুর রহমান তালুকদার বলেন, “এমন ঘটনা আসলে অফিসিয়ালি সম্ভব না, পিন বা ওটিপি অফিস চাইতে পারে না। লিখিত কমপ্লেইন দিলে বিষয়টা আমরা দেখবো।”