Image description

ভ্রমণ ভিসায় ঢাকায় এসে উত্তরায় সিনথেটিক মাদক কিটামিন তৈরির ল্যাব স্থাপন করেন তিন চীনা নাগরিক। ওই ল্যাবে কিটামিন প্রস্তুত করে দুবাই, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কায় পাচার করে আসছিলেন তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তারা একই বাসায় বেশিদিন থাকতেন না, গ্রেপ্তার এড়াতে ঘন ঘন বাসা বদল করতেন।

‘ক’ শ্রেণির মাদকদ্রব্য কিটামিন সাদা পাউডার আকারের। এটি বাংলাদেশে প্রথম ধরা পড়ে ২০১১ সালে। এরপর সেভাবে ধরা পড়েনি। তবে সম্প্রতি কিটামিনের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণত বিদেশ থেকে এনে বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে পাচার করে মাদক কারবারিরা। কিন্তু খোদ ঢাকায় ল্যাব স্থাপন করে উৎপাদনের ঘটনা ছিল অজানা।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের একটি দল গত বুধবার রাতে উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১/এ রোডের ২৯ নম্বরের লায়লা গার্ডেন নামে আবাসিক ভবনের অষ্টম তলার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালায়। সেখানে কিটামিন তৈরির একটি ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায় এবং তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন লি বিন (৫৯), ইয়াং চুংছেং (৬২) ও ইউ ঝে (৩৬)।

জব্দ করা হয় কিটামিন তৈরিতে ব্যবহৃত কেমিক্যাল সালফিউরিক এসিড, ইথানল এবং পলি প্যাকেট সিল করার মেশিন। এর আগেই এ চক্র একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসে কিটামিনের একটি চালান পাচারের উদ্দেশ্যে বুকিং করেছিল। চালানটি আটক করা হয়েছে। ওই চালান এবং বাসার ল্যাব মিলিয়ে ছয় কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন সাদা পাউডার জব্দ করা হয়। এগুলোর মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। তিন মাস আগে ওই বাসাটি ভাড়া নেন তিন চীনা নাগরিক। চীনা নাগরিক ইউ ঝের ভিসার মেয়াদ প্রায় দেড় বছর আগে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। তিনি অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তিন চীনা নাগরিক ওই আবাসিক ফ্ল্যাটটি মূলত কিটামিন তৈরির ল্যাব হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন। সেখান থেকেই তারা এই সিনথেটিক মাদক প্রস্তুত ও সরবরাহ করতেন। এই চক্র একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে গত ১৬ জানুয়ারি দুবাই এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়ায় কিটামিনের চালান পাঠানো হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান সমকালকে বলেন, সাউন্ড সিস্টেমের মধ্যে বিশেষ কৌশলে শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় পাচারের সময় কিটামিনের চালান জব্দ করা হয়। এরপর ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে আরও কিটামিন পাওয়া যায়। এ চক্রের সঙ্গে আরও কারা জড়িত এবং দেশে কোথায় কোথায় এই মাদক সরবরাহ করা হতো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কিটামিন জব্দ ও তিনজন গ্রেপ্তারের ঘটনায় ২৬ মার্চ ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের এসআই আবদুল্লাহ আল মামুন টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, ২৫ মার্চ গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন সুন্দর আলী রোডের একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসে খাকি রঙের ছোট কার্টনের পার্সেল সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তল্লাশি করা হয়। এতে একটি ছোট সাউন্ড স্পিকারের মধ্যে বিশেষভাবে লুকানো জিপারযুক্ত পলি প্যাকেটে কিটামিন পাওয়া যায়। পার্সেলটি শ্রীলঙ্কায় পাঠানোর জন্য একজন চীনা নাগরিক বুকিং করেছিলেন। এর পর উত্তরার ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।

কিটামিন মূলত একটি শক্তিশালী চেতনানাশক ওষুধ, যা চিকিৎসাক্ষেত্রে, বিশেষ করে ট্রমা, জরুরি অস্ত্রোপচার এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে এর হ্যালুসিনোজেনিক ও বিচ্ছিন্নকারী প্রভাবের কারণে এটি বর্তমানে অবৈধ মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ডিএনসির মহাপরিচালক হাসান মারুফ সমকালকে বলেন, গ্রেপ্তার তিন চীনা নাগরিক বাংলাদেশে বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করে কিটামিন উৎপাদন করত। এর পর তারা আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে এই মাদক বিভিন্ন দেশে বসবাসরত চীনা কমিউনিটির কাছে পাঠাত। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তাদের 
ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায়। সব ধরনের মাদকদ্রব্যের বিষয়ে আমাদের কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।