রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড এখন যেন মৃত্যুকূপ। সেখানে প্রতিদিনই শোনা যায় স্বজনহারাদের কান্না। সে কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। তবে সন্তানের নিথর দেহ বুকে চেপে অসহায় মা-বাবার আর্তনাদ পৌঁছে না দায়িত্বশীলদের কাছে। ফলে বাড়ে না শিশু রোগীদের জন্য আইসিইউ বেড। আর আইসিইউ সুবিধা না পেয়ে মারা যাওয়া শিশুদের অভিভাবকদের ভাগ্যের ওপর দোষারোপ করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না।
এদিকে, তিন বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০০ শয্যার রাজশাহী শিশু হাসপাতাল। বিশেষায়িত এ হাসপাতাল চালু হলে রাজশাহীসহ আশপাশের জেলাগুলোর অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা অনেক সহজলভ্য হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট) সুবিধা না পেয়ে গত আড়াই মাসে মারা গেছে ৫৩ শিশু। এছাড়া আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার পরও মারা গেছে ৯ জন। সব মিলিয়ে এত অল্প সময়ে ৬২ শিশুর মৃত্যু হাসপাতালটির দুর্বল চিকিৎসাব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা সামনে এনেছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, মারা যাওয়া শিশুদের অধিকাংশই নিউমোনিয়া ও হামে আক্রান্ত ছিল। চিকিৎসকদের মতে, এসব রোগ জটিল আকার ধারণ করলে আইসিইউ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু রামেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য আলাদা আইসিইউ নেই। সাধারণ আইসিইউর ১২টি বেডের কয়েকটি শিশুদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
হাসপাতালে গিয়ে শিশু ওয়ার্ডে চরম ভিড় দেখা যায়। একটি বেডে দুই-তিন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বেড না পাওয়ায় অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসা। সেই সঙ্গে অক্সিজেনের জন্য অপেক্ষা আর চিকিৎসকদের ব্যস্ততা মিলিয়ে চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে স্বজনদের মধ্যে।
পাশের নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার এনজিওকর্মী রেহেনা বেগম তার সাড়ে সাত মাস বয়সি সন্তানকে নিয়ে এসেছেন হাসপাতালে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগছে সে। চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও বেড খালি না থাকায় তাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়। এখন তার প্রতিটি দিন অনিশ্চয়তায় কাটছে। রেহেনা বেগমের মতো অনেক শিশু রোগীর অভিভাবকই প্রতিদিন এ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন।
জানতে চাইলে হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ১২ শয্যার এই ইউনিটে কোনো রোগী মারা না গেলে বেড খালি হয় না। ফলে অপেক্ষমাণ তালিকা দীর্ঘ হয়। গত আড়াই মাসে আইসিইউ না পেয়ে ৫৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তিনি জানান, শুধু ১১ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যেই অপেক্ষমাণ অবস্থায় মারা গেছে ২৮ শিশু।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের তরিকুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক জানান, তার ছয় মাস বয়সি সন্তান রিদুয়ান হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, আইসিইউ সুবিধা না পেয়ে গত ১৮ মার্চ তার সন্তানের মৃত্যু হয়।
একই দিন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার শাহীন হোসেনের ১০ মাস বয়সি সন্তান জিহাদও মারা যায়। তার কণ্ঠেও আক্ষেপ ঝরে—‘আইসিইউ সুবিধা পেলে হয়তো আমার বাচ্চাটা বাঁচত।’
স্থানীয় সমাজকর্মী মাহবুব আলম বলেন, একটি বিভাগীয় শহরের সবচেয়ে বড় হাসপাতালে শিশুদের জন্য আলাদা আইসিইউ না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রতিদিন শিশুমৃত্যুর এ মিছিল আমাদের ব্যর্থতারই প্রমাণ। অবিলম্বে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাজশাহী নাগরিক ফোরামের সদস্য রাকিবুল ইসলাম বলেন, শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, সেটি চালু করার উদ্যোগ থাকতে হবে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শিশু হাসপাতাল পড়ে আছে আর এদিকে আইসিইউ না পেয়ে শিশু রোগী মারা যাচ্ছে, এটি মেনে নেওয়া যায় না।
চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও হাম রোগের প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত টিকা পায়নি, তারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। হাম প্রতিরোধযোগ্য হলেও টিকাদানে ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। দ্রুত টিকা কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকেএম মাসুদ উল ইসলাম বলেন, দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালকে সক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি সেবা দিতে হচ্ছে। তবে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, হাসপাতালের দুটি শিশু ইউনিটে প্রায় ৭৫০ রোগী ভর্তি থাকে, যেখানে শয্যা রয়েছে মাত্র ১৬০টি। এর মধ্যে অন্তত ৫ শতাংশ শিশুর আইসিইউ প্রয়োজন হওয়ায় প্রতিদিন ৩৫-৪০ জনকে নিবিড় পরিচর্যা দিতে হয়।
তিনি আরো জানান, সংকট মোকাবিলায় ৫০ শয্যার একটি আইসিইউ কমপ্লেক্স তৈরি করা হলেও জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে সেটি এখনো চালু হয়নি। দ্রুত এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।