টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে বাসের তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় রেললাইনে অপেক্ষা করার সময় ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় নিহিতরা সবাই একই বাসের যাত্রী এবং তাদের মধ্যে চারজনই একই পরিবারের সদস্য। শুক্রবার রাত ৮টার দিকে উপজেলার ধলাটেংগর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক সংলগ্ন রেললাইনে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত ৫ জনই গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার পূরাব নিজপাগা গ্রামের বাসিন্দা। নিহতরা হলেন—গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার পূরাব নিজপাগা গ্রামের হামিদুল ইসলামের স্ত্রী নার্গিস (৩৫), তার ছেলে নীরব (১২), নার্গিসের বড় ছেলের শাশুড়ি দোলা (৩৫), একই এলাকার রাইজেল মিয়ার ছেলে সুলতান (৩৩) ও আবদুর রশিদের মেয়ে রিফা (২৩)। বাসের আরেক যাত্রী মায়া জানান, সকাল ১০টায় তারা রওনা হয়েছিলেন। দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি কাটাতে রেললাইনে বসাই যেন তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।
প্রত্যক্ষদর্শী ও রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী বাসটি শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে কালিহাতীর ধলাটেংগর এলাকায় পৌঁছালে জ্বালানি তেল শেষ হয়ে যায়। চালক ও সহকারীরা তেল আনতে গেলে দীর্ঘ সময় বাসটি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। বাসের ভেতরে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক যাত্রী নিচে নেমে আশপাশে ঘোরাঘুরি শুরু করেন। মহাসড়কের পাশেই সমান্তরালভাবে থাকা রেললাইনের ওপর বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন একটি পরিবারের সদস্যরা। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জগামী ‘সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি চলে আসে। ট্রেনের চালক হর্ন দিলেও লাইনে বসে থাকা ৫ যাত্রী সময়মতো সরে যেতে পারেননি। মুহূর্তেই ট্রেনের চাকায় পিষ্ট হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাদের দেহ।
টাঙ্গাইল রেলওয়ে স্টেশন ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান জানান, বাসটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মহাসড়কে থেমে ছিল। বাসের যাত্রীরা নিচে নেমে রেললাইনে বসে থাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। রাত ১০টা পর্যন্ত মরদেহগুলো দুর্ঘটনাস্থলেই পড়ে ছিল।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘রেললাইনে অবস্থান করা ব্রিটিশ আমল থেকেই আইনত নিষিদ্ধ। স্টেশন থেকে দূরে হওয়ায় সেখানে তদারকির সুযোগ ছিল না। স্রেফ অসতর্কতার কারণেই একটি পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেল।’
এদিকে ঈদযাত্রাকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়েই দেশে একের পর এক বড় দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। এর আগে ২১ মার্চ দিবাগত রাতে কুমিল্লায় বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হন। ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে বাস ডুবে ২৬ জন নিহত হন। পরদিন ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কালাকচুয়া এলাকায় বাসের ধাক্কায় প্রাইভেটকারের চালকসহ ৫ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে চারজনই একই পরিবারের সদস্য ছিলেন।
ঈদের সময় দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বাড়ছে বলেও জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ১৭ থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত ১০ দিনে দেশে ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন। গত বছর ঈদুল ফিতরের ছুটির সময় ১১ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ২৪৯ জন। সেই হিসাবে এবার প্রাণহানি আরও বেশি।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)–এর তথ্য অনুযায়ী, ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সাত দিনে দেশে ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন।