নোয়াখালীর চন্দ্রগঞ্জ কারামতিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাশ করে উচ্চমাধ্যমিকে (আলিম) ভর্তি হওয়ার কথা মো. আবদুর রহমানের। তবে ভর্তির আগেই উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন পূরণের আশায় মাদ্রাসার পড়াশোনা বাদ দিয়ে কলেজে ভর্তি হন তিনি। তার দাবি, দেশের চাকরির বাজারে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা এখনো বৈষম্যের শিকার। সেই কারণেই দাখিলের পর জেনারেল শিক্ষায় গুরুত্ব বাড়াতে কলেজে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
শুধু আবদুর রহমানই নন, দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বৈষম্য, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের স্বল্পতা এবং চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তার মতো নানা কারণে দাখিল শেষ করেই মাদ্রাসা শিক্ষার ইতি টানছেন অনেক শিক্ষার্থী। পরে তারা দেশের বিভিন্ন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঝুঁকছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে দাখিল শেষ করার পর প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই আলিম স্তরের শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে অথবা অন্য শিক্ষা বোর্ডে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে ২০২৫ সালের দাখিল ও আলিম দুই স্তরেরই পাশের হারের নজিরবিহীন বিপর্যয়।
প্রধানত আরবি বিষয়ে দূর্বলতার জন্যই শিক্ষার্থীরা দাখিলের পর আর মাদ্রাসায় ভর্তি হতে চায় না। যে বিষয় পড়ে আনন্দ পায় না বুঝে না, সেই বিষয় চালিয়ে যাওয়া আসলেই সহজ নয়। এছাড়া চাকরির বাজারে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অবহেলার শিকার হতে হয়। উভয় শিক্ষাব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক মর্যাদাও এক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। এজন্য আমাদের শিক্ষার্থীরা হীনমন্যতায় ভোগেন। এছাড়া মাদ্রাসায় পোষাক-পরিচ্ছদেরও একটা বাধ্যবাধকতা থাকে, সেটিতে অনেকেই অভ্যস্ত থাকতে চায় না।— অধ্যক্ষ আ ন ম নিজাম উদ্দিন, রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসা, লক্ষ্মীপুর।
বিগত তিন বছরের (২০২৩-২০২৫) মাদ্রাসা বোর্ডের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দাখিল পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পৌনে তিন লাখের ঘরে থাকলেও আলিম পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রতি বছরই কমছে।
এক পরিসংখ্যান দেখা গেছে, ২০২৩ সালে দাখিল পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৩৩.২১ শতাংশ শিক্ষার্থী আলিম স্তরের পরীক্ষয় অংশগ্রহন করেছেন। ২০২৪ সালে এই হার কমে দাঁড়ায় ৩০.৪১ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে এই হার আরও কমে ২৯.৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ জন দাখিল শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২৯ জন আলিম পর্যন্ত লেখাপড়া করছেন। বাকি ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশই সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি চলে যাচ্ছে অথবা কারিগরি শিক্ষায় যুক্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের তাগিদে পড়াশোনার ইতি টানছে তারা।
গত বছর ২০২৫ সালের ফলাফল মাদ্রাসা বোর্ডের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের তুলনায় দাখিলে পাশের হার কমেছে প্রায় ১১.৫৭শতাংশ এবং আলিমে পাশের হার কমেছে প্রায় ১৭.৭৯শতাংশ। বিশেষ করে আলিমের পাশের হার ৯৩ শতাংশ থেকে এক লাফে ৭৫ শতাংশে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিযোগিতার বাজারে আধুনিক কারিকুলামে পিছিয়ে থাকা এবং ধর্মীয় শিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থী কমে যাওয়া-ই মাদ্রাসার উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন চাকরির ক্ষেত্রে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভিন্নভাবে দেখার সংস্কৃতি। ফলে শৈশব থেকে আলেম হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরাই শেষ পর্যন্ত এই শিক্ষাক্রমের মধ্যে থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করছে। অনেকেই পড়াশোনার মাঝপথে এসে আধুনিক শিক্ষাক্রমে নিজের গতি পরিবর্তন করে নেয়।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আ ন ম নিজাম উদ্দিন বলেন, প্রধানত আরবি বিষয়ে দূর্বলতার জন্যই শিক্ষার্থীরা দাখিলের পর আর মাদ্রাসায় ভর্তি হতে চায় না। যে বিষয় পড়ে আনন্দ পায় না বুঝে না, সেই বিষয় চালিয়ে যাওয়া আসলেই সহজ নয়। এছাড়া চাকরির বাজারে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অবহেলার শিকার হতে হয়। উভয় শিক্ষাব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক মর্যাদাও এক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। এজন্য আমাদের শিক্ষার্থীরা হীনমন্যতায় ভোগেন। এছাড়া মাদ্রাসায় পোষাক-পরিচ্ছদেরও একটা বাধ্যবাধকতা থাকে, সেটিতে অনেকেই অভ্যস্ত থাকতে চায় না।
তিনি আরও বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা আলেমের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ইসলামি স্টাডিজ নেন। আসলে এতে আরবিতে দক্ষ হয়ে উঠা সম্ভব নয়। মাদ্রাসায় যেভাবে হাতে-কলমে হাদিস ও তাফসিরের বড় বড় কিতাবসমূহ (গ্রন্থসমূহ) পড়ানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা সম্ভব হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সাথে বেসিক আরবি না জানা জেনারেল লাইনের শিক্ষার্থীরাও ইসলামি স্টাডিজে ভর্তি হয়ে থাকে।