Image description

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন সদস্য নিয়োগে ভয়ংকর এক প্রবণতা সামনে এসেছে—কোরআন হাতে শপথ করিয়ে তরুণদের গ্যাংয়ে যুক্ত করা। শপথ গ্রহণের এ ভিডিও ধারণ করে বিদেশে পাঠানোর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে সদস্যপদ। নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া সদস্যরা ভিডিও বার্তায় কোরআন শপথ করে বলছেন, ‘আমার জীবন আজ থেকে সাজ্জাদ ভাইয়ের হাতে… মরলেও বেঈমানি করব না।’

সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানান, প্রথমে স্থানীয় পরিচিতদের খুঁজে বের করা হয়, এরপর ছোট ভিডিও রেকর্ড করে দুবাইয়ে পাঠানো হয়। অনুমোদন মিললে রিক্রুটরা পূর্ণ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন। এখানে ধর্মকে সরাসরি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সম্প্রতি এ কৌশলে যুক্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন—আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী রিমন, মনির ও সায়েম। তাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, এসএমজি, ম্যাগাজিনসহ বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, আটকদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে কয়েকটি ভিডিও। সেখানে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘কোরআনের ওপর হাত রেখে বললাম, আমার জীবন আজ থেকে সাজ্জাদ ভাইয়ের হাতে তুলে দিলাম। তার জন্য যদি জীবন দিতে হয় জীবন দেব, মরব। কিন্তু কখনো ভাইয়ের সঙ্গে বেঈমানি করব না...।’ এই ভিডিও দুবাইয়ে অবস্থানরত সাজ্জাদের কাছে পাঠানো হয়। অনুমোদন পেলেই তারা পূর্ণ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন। পুরো প্রক্রিয়ায় একজন পুরোনো সদস্যকে জামিনদার থাকতে হয়। ভিডিওতে নিরাপত্তার স্বার্থে শপথকারীর ছবি ব্লার করে রাখা হয়।

কোরআন হাতে শপথ কেন

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এ শপথ আসলে ধর্মীয় নয়; বরং মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কৌশল। এতে সদস্যদের মধ্যে এমন এক ভয় ও দায়বদ্ধতা তৈরি হয়, যা তাদের গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ আনুগত্যে বাধ্য করে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় আবেগ, পারিবারিক ট্রমা ও মাদকাসক্তিকে কাজে লাগানো হয়। এতে তরুণরা দ্রুত মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারান। ফলে তারা গ্যাংয়ের নির্দেশে জীবন দিতেও প্রস্তুত হয়ে যান।

মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. শাহীনুর রহমান বলেন, কোরআন হাতে শপথ নেওয়ার সময় মানুষ মানসিকভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। এ শপথ তাদের মধ্যে এমন এক দায়বদ্ধতা ও ভয় জন্ম দেয় যে, তারা গোষ্ঠীর আদেশ মেনে চলার জন্য জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়ে যান।

কোরআন হাতে শপথ করে সাজ্জাদের দলে অন্তর্ভুক্ত তিনজনের সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ-এর এই প্রতিবেদক। এর মধ্যে একজন ২০১৬ সালে ওই দল থেকে বের হয়ে আসেন। আরেকজন বর্তমানে ইতালিতে আছেন। বাকিজন দেশে। তাদের একজন বলেন, শপথের সময় আমরা বুঝেছিলাম, এরপর আমাদের প্রতিটি কাজ প্রধান সাজ্জাদের নির্দেশমতো হবে। বেঈমানি করলে ফল ভয়ংকর হবে। অন্যজন যোগ করেন, শপথ নেওয়ার পর আমরা পুরোপুরি বাহিনীর জন্য আত্মউৎসর্গী হয়ে যাই। তৃতীয় সদস্য বলেন, ভিডিও পাঠানোর মাধ্যমে আমাদের স্বীকৃতি নিশ্চিত হয়। অনুমোদন মিলে গেলে আমরা পূর্ণ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হই। এ প্রক্রিয়া আমাদের মধ্যে আনুগত্য ও আত্মত্যাগী মনোভাব তৈরি করে, যা আমাদের বাহিনীর উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ নিবেদিত করে।

নব্বই দশক থেকে টিকে থাকা শপথের প্রথা

সাজ্জাদ বাহিনী থেকে ফিরে আসা ওই তিনজন জানান, নব্বই দশকের শুরু থেকেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন সদস্যদের মধ্যে আনুগত্য নিশ্চিত করতে কোরআন হাতে শপথ পড়ানোর প্রথা চালু ছিল। সে সময় ‘শিবির’ নাছিরের নেতৃত্বাধীন আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন ফিল্ড অপারেটর ও সক্রিয় সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো।

নব্বই দশকের শুরুতে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড ছিল নাছিরের দখলে। তার বাহিনীর অন্যতম তরুণ সদস্য হিসেবে উঠে আসেন সাজ্জাদ আলী খান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু নাছির বাহিনীর ফিল্ড অপারেটরই নয়, পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাবশালী নাম হয়ে ওঠে।

১৯৯১ থেকে ২০০৪—এই ১৩ বছরে ক্রসফায়ার, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পাল্টা হামলায় নাছির বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। কেউ মারা যান, কেউ দেশ ছাড়েন, কেউ জেলে যান। নাছিরের দুর্বলতায় যখন আন্ডারওয়ার্ল্ডে নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়, তখনই সুযোগটি কাজে লাগান সাজ্জাদ।

ওই সময় সাজ্জাদের নাম জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে। ১৯৯১ সালে যুবলীগকর্মী শ্যামল, জাফর ও দিদার হত্যা; ১৯৯৭ সালে ওমরগণি এমইএস কলেজের ছাত্রলীগ নেতাদের টার্গেট কিলিং; ১৯৯৯ সালে ওয়ার্ড কমিশনার লিয়াকত আলী খান খুন; ২০০০ সালের ১২ জুলাই ব্রাশফায়ারে আটজনকে হত্যা, একই বছর ছাত্রলীগ নেতা আবুল কাশেম ও আবু তাহেরকে হত্যা—সবক্ষেত্রেই তার ভূমিকা উঠে আসে। এছাড়া ২০০৪ সালের দুই বড় ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এগুলো হলো—১১ এপ্রিল বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম রাব্বানী হত্যা এবং কালুরঘাট শিল্প এলাকায় ৫৬ লাখ টাকা লুটের ঘটনা। ২০০৪ সালের ৩০ জুন বালুচরা এলাকায় নিজেদের গ্রুপের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ছোট সাইফুল, তার ভাই আলমগীর ও বোন মনোয়ারা বেগম খুন হন। ওই সংঘর্ষের পর পুরোনো বাহিনী কার্যত ভেঙে পড়ে। ঠিক সে সময়েই ভয়, প্রভাব ও টিকে থাকার ক্ষমতায় অন্যদের ছাপিয়ে উঠে আসেন সাজ্জাদ আলী খান। নাছির-পরবর্তী শূন্য রাজনীতিতে তিনি হয়ে যান আন্ডারওয়ার্ল্ডের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক।

শপথ নিয়ে সাজ্জাদের কিলার হয়ে উঠলেন তারা

চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণকারী একাধিক তদন্ত সূত্র বলছে, বর্তমানে বড় সাজ্জাদের ‘হিটম্যান’ হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত চারজন হলেন—রায়হান আলম, ছোট সাজ্জাদ, মোবারক ইমন এবং শহিদুল ইসলাম বুইস্যা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছোট সাজ্জাদ বড় সাজ্জাদ গ্রুপের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। গত বছরের ২৯ আগস্ট এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জেরে প্রতিপক্ষ বাবলার সহযোগী আনিস ও কায়সারকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার অনন্যা আবাসিকে গুলি করে হত্যা করেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর চাঁদা না পেয়ে অক্সিজেন কালারপুল এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে প্রকাশ্যে গুলি ছোড়েন। পুলিশ তাকে ধরতে তৎপর হলে ৪ ডিসেম্বর অক্সিজেন এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালানো হয়। কিন্তু অভিযানের মধ্যেই সাজ্জাদ পুলিশকে গুলি করে পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে পালিয়ে যান। এতে দুই পুলিশ সদস্যসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। ২৯ জানুয়ারি নিজের ফেসবুকে বায়েজিদ থানার তৎকালীন ওসি আরিফুর রহমানকে অক্সিজেন এলাকায় প্রকাশ্যে পেটানোর হুমকি দেন। পরদিনই নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ তাকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। অবশেষে গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিংমলে স্থানীয় কয়েকজন তাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।

কারাগারে গিয়েও সাজ্জাদ আলোচনায় থাকেন। বাকলিয়ায় জোড়া খুন, ঢাকাইয়া আকবর খুন এবং সর্বশেষ সরওয়ার বাবলা হত্যাকাণ্ডে তার সহযোগীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে আসে।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এই গ্রুপের সদস্যরা এতটাই নিবেদিত যে, সাজ্জাদের হয়ে কাজ করাকে তারা ঈমানি দায়িত্ব মনে করেন। অনেকটা জঙ্গিগোষ্ঠীর কাজের মতো।

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, রায়হানের বিরুদ্ধে খুন, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজিসহ অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত ৫ আগস্টের পর তার বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে আটটি হত্যা মামলা। ৫ নভেম্বর বাবলাকে খুন করার আগেই ফোনে সরাসরি হুমকি দেন রায়হান—এমন অডিও তদন্তকারীদের হাতে রয়েছে।

মোবারক ইমন ও বুইস্যা বর্তমানে বড় সাজ্জাদের ডান-বাম হাত হিসেবে কাজ করছেন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা, চাঁদা আদায়, নিরাপদ রুট নিশ্চিত করা—সবকিছুই তাদের দায়িত্বে। এর মধ্যে মোবারক ইমন সাজ্জাদের অস্ত্রভান্ডার এবং অস্ত্র পরিবহনের দায়িত্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।