রাজধানীর উত্তরায় গোপন ল্যাবে কেটামাইন উৎপাদনের ঘটনা উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ‘ট্রানজিট রুট’ থেকে সরাসরি উৎপাদনকেন্দ্রে রূপ নেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বহু বছর ধরে ‘পার্টি ড্রাগ’ নামে পরিচিত সিনথেটিক মাদক কেটামাইনের ব্যবহার এশিয়াজুড়ে বাড়তে থাকায় এই অঞ্চলে এর অবৈধ বাজার বিস্তৃত হয়েছে। আগে আমেরিকা ও ইউরোপে এর চাহিদা বেশি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে ডার্ক ওয়েবের অর্ডার, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং কুরিয়ারের মাধ্যমে পাচারের সুবিধা নিয়ে মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে চক্রগুলো। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ, যা আগে শুধু পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হতো, এখন উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রাজধানীর উত্তরায় একটি গোপন ল্যাবের সন্ধান পেয়েছে, যেখানে চীনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র কেটামাইন তৈরি করছিল। গত বুধবার রাতভর পরিচালিত অভিযানে সেখান থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কেটামাইন, বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ সময় ইয়াং চুংসেন, ইউ জি ও লি বিন নামে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চক্রটি ভাড়া বাসায় ল্যাব স্থাপন করে গোপনে কেটামাইন উৎপাদন করত এবং নিজস্ব ক্লায়েন্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করত। তারা ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে অর্ডার নিত এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিজেদের বাজার তৈরি করেছিল। পাচারের ক্ষেত্রে তারা নানা কৌশল ব্যবহার করত, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে পরিকল্পিতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল।
ডিএনসির কর্মকর্তারা জানান, আগে তোয়ালের মধ্যে ড্রাই আকারে কেটামাইন লুকিয়ে পাঠানো হতো। দীর্ঘ সময় পানিতে গরম করে গ্যাস বের করে সেটিকে আবার শুকিয়ে তোয়ালে দিয়ে মোড়ানো হতো এবং গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর পর তা আবার তরল বা পাউডার আকারে রূপান্তর করা হতো। তবে নতুন কৌশলে চক্রটি সাউন্ড বক্সের ভেতরে পলিথিনে মোড়ানো পাউডার কেটামাইন ভরে ফুয়েল পেপার দিয়ে মুড়িয়ে পাচার করছিল। কখনো সাউন্ড বক্সে, কখনো তোয়ালের ভেতরে লুকিয়ে এই মাদক বিদেশে পাঠানো হতো।
এর আগে ২০২৫ সালে গাজীপুরের টঙ্গী থেকে প্রায় ৬ কেজি ৪৪ গ্রাম কেটামাইন জব্দ করা হয়েছিল, যা তোয়ালের ভেতরে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে ইতালিতে পাচারের চেষ্টা চলছিল। সেই ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এবারও টঙ্গী থেকে শ্রীলঙ্কার উদ্দেশ্যে পাঠানো একটি কুরিয়ার থেকে কেটামাইন জব্দ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে চক্রটি পাচারের মাধ্যম হিসেবে কুরিয়ার ব্যবস্থাকেই বেশি ব্যবহার করছে।
ডিএনসির এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার হওয়া চক্রটি গত তিন থেকে চার মাস ধরে বাংলাদেশে ল্যাব স্থাপন করে মাদক তৈরি করছিল। তাদের পাসপোর্টসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে এবং তারা কবে দেশে এসেছে ও তাদের সঙ্গে আর কারা জড়িত তা তদন্তাধীন রয়েছে।
ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দা টিম গত ৮-১০ দিন ধরে নজরদারির মাধ্যমে এই চক্রের সন্ধান পায়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ল্যাবটির অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। তারা বিভিন্ন ব্যথানাশক ওষুধ ও কাঁচামাল সংগ্রহ করে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে কেটামাইন তৈরি করত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দেশের ভেতরে যেন এ ধরনের মাদক উৎপাদন না হয় সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে।’
জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল অঞ্চলে মাদক পাচারের রুট হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনো অঞ্চলে চাপ তৈরি হলে কারবারিরা অন্য অঞ্চলে উৎপাদনের চেষ্টা করে। সম্ভবত সেই কারণেই এখন এই অঞ্চলে কেটামাইন উৎপাদনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেটামাইন অত্যন্ত ভয়ংকর মাদক, যা মানুষের মস্তিষ্কে হ্যালুসিনেশন তৈরি করে এবং তখন তারা নিজেদের সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখতে পারে না।’