Image description

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সরকার পাঁচ বছরে ভারী গাড়ির তিন লাখ দক্ষ চালক তৈরির পরিকল্পনা করেছিল। সে জন্য উন্নয়ন প্রকল্প ছক-ডিপিপি তৈরি করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন—বিআরটিসি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছিল। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ঝুলে আছে সেই প্রকল্প। সাত বছর ধরে এটি ফাইলবন্দি পড়ে আছে।

নানা বাহানায় এটির আর অনুমোদনই হয়নি। অন্যদিকে সরকারিভাবে নিবন্ধিত এক হাজার ৬৫০ প্রশিক্ষকের বেশির ভাগকেই ‘অকার্যকর’ করে রাখা হয়েছে। কারণ তাদের জুতসই কর্মসূচিই নেই। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে প্রশিক্ষণের অভাবে দক্ষ গাড়িচালক সেভাবে বাড়ছে না।

জানা গেছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএ ও বিআরটিসি পেশাদার গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণব্যবস্থা চালু রেখেছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। দক্ষ চালকের অভাবে অহরহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। শুধু সাম্প্রতিক ঈদ মৌসুমের ১০ দিনেই ২৭৯ ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে সড়কে।
  বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান কালের কণ্ঠকে এ বিষয়ে জানান, গত ১৭ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৯ ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে। তাঁর মতে, বেশির ভাগ দুর্ঘটনার বড় কারণ চালকের দক্ষতার অভাব। প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হলে এমন অবস্থা হতো না।

এদিকে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, প্রায় ৯০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অতিগতি। এ ছাড়া সড়ক ও গাড়ির অবস্থাসহ অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।

বিআরটিসি সূত্র জানায়, বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বিআরটিসি ‘ভারী যানবাহনের চালক তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান’ শীর্ষক প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে সংস্থাটি। বছরে ৬০ হাজার দক্ষ চালক তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেটি তৈরি করা হয়েছিল। বিআরটিসির তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণটি ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত চালিয়ে তিন লাখ দক্ষ ভারী যানবাহনের চালক তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৯৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। ২০২০ সালের করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে প্রকল্প অনুমোদন ঝুলিয়ে রাখা হয়। করোনা সংকট  শেষ হওয়ার পরও প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি—একনেক সভায় উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। বারবার প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভাও হয়। প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় সংযোজন-বিয়োজন করা হয়।  বিআরটিসির সাবেক চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রকল্প ব্যয় আরো কমিয়ে তা অনুমোদনের গুরুত্ব তুলে ধরে তা অনুমোদন করানোর চেষ্টা চালান। তার পরও সেটির অনুমোদন করা সম্ভব হয়নি। জানতে চাইলে বিআরটিসির জেনারেল ম্যানেজার (আইসিডব্লিউএস ও প্রশিক্ষণ) ফাতেমা বেগম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে ওই প্রকল্প অনুমোদন হয়নি। এ অবস্থায় আমাদের স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রামের আওতায় আট হাজার গাড়িচালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যে গত বছর থেকে কর্মসূচি চলছে। এটি ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলবে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৬০ হাজার গাড়িচালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কর্মসূচি আগামী মে থেকে শুরু হবে। বিআরটিসির চারটি ইনস্টিটিউটসহ সব মিলে ২৭টি কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। 

প্রশিক্ষণসংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাব বিআরটিসি তৈরি করেছিল ২০১৯ সালে। ওই প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, হালকা বা মধ্যম লাইসেন্সধারী গাড়িচালকদের মধ্যে ভারী যানবাহন চালানোর অভিজ্ঞতা আছে—এমন গাড়িচালকদের দুই সপ্তাহ মেয়াদি ভারী যানবাহন চালনার উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। হালকা ও মধ্যম লাইসেন্সধারী গাড়িচালকদের মধ্যে যাঁদের ভারী যানবাহন চালানোর অভিজ্ঞতা নেই, তাঁরা পাবেন চার সপ্তাহ মেয়াদি ভারী যানবাহন চালনার উচ্চতর প্রশিক্ষণ। প্রকল্পের আওতায় পাঁচ বছরে তিন লাখ প্রশিক্ষণার্থীর প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এর মধ্যে বিআরসিটির ২৪টি কেন্দ্রে, আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের (এএফডি) ২৪টি কেন্দ্রে, রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটির (আরটিসি) ২৬টি কেন্দ্রে, একটি বাংলাদেশ পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ও ১৯টি আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (বিআরটিএ নিবন্ধিত সক্ষম ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান) প্রশিক্ষণ পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রথমে প্রশিক্ষণার্থী প্রতি দৈনিক খোরাকি ভাতা এক হাজার টাকা ও খাবার ভাতা ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সব প্রস্তুতির পর প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি।

ড্রাইভার্স ট্রেনিং সেন্টার—ডিটিসির সাবেক চেয়ারম্যান, পরিবহন বিশ্লেষক মো. নুর নবী শিমু বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের বড় ও উপযোগী পরিকল্পনা নেই। দেশে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৬৫০ জন বিআরটিএ অনুমোদিত প্রশিক্ষক আছেন। তাঁদের বেশির ভাগকে সরকার কাজে লাগাচ্ছে না। ২০১২ সালের দিকে বিআরটিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান খানের তত্ত্বাবধানে ২০০ প্রশিক্ষক তৈরি করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে আরো প্রশিক্ষক তৈরি করা হয়। ২০১৮ সালে সরকার একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এক হাজার ৪২০ জন প্রশিক্ষক তৈরি করে। তাঁদের কাজ হওয়ার কথা ছিল, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে গাড়ি চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও বিআরটিএ অনুমোদিত বিভিন্ন ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষক হিসেবে অংশ নেওয়া। বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টার আছে প্রায় দেড়শটি।

বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুল মালিক সমিতির সংগঠক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দুর্ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রে চালকদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষকদের কাজে যুক্ত করা জরুরি। প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন সময় প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়, কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারি প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণে যুক্ত হওয়ার আশায় একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কেউ কেউ করেছিলেন। প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় অনেকে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।

ঢাকার ধানমণ্ডিতে গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যুক্ত প্রশিক্ষক আব্দুল জব্বার বলেন, সরকার উদ্যোগ নিলে প্রশিক্ষকরা গাড়িচালকদের ভালো মানের প্রশিক্ষণ দিয়ে দুর্ঘটনা কমাতে পারে। রাজধানীর উত্তরার কাজী ড্রাইভিং স্কুলের মালিক কাজী মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমি নিজেও সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছি। প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম—নসিমন, করিমন, ভটভটি ও অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে চালকদের প্রশিক্ষণবিহীন কোনোভাবে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না।’