Image description

মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া এবং রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটগুলো দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই সচল রয়েছে। প্রত্যেকটি ফেরিঘাটের সংযোগ রাস্তা অধিক ঢালের পাশাপাশি খানাখন্দকের সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া প্রত্যেকটি পন্টুনে উচ্চতর রেলিং না থাকায় প্রতিনিয়তই ঝুঁকির মধ্যদিয়ে ফেরিগুলোতে যানবাহন লোড-আনলোড করা হচ্ছে। এতে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ বুধবার বিকালে দৌলতদিয়ার ৩ নং ফেরিঘাটের পন্টুন ভেদ করে সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে নিমজ্জিত হয়ে ২৬ যাত্রীর সলিল সমাধি হয়েছে। এ জন্য ঘাটের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন স্থানীয়রা। তবে ঘাট কর্তৃপক্ষ সেটা মানতে নারাজ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া নৌরুটে দীর্ঘদিন ধরেই অব্যবস্থাপনার মধ্যদিয়েই যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা হয়েছে। ঘাট এলাকার মানুষজনের অভিযোগ, দুর্ঘটনাটি ঘটার অন্যতম কারণ হচ্ছে ঘাট কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি। রেলিংবিহীন অরক্ষিত পন্টুন দিয়ে ফেরিতে যানবাহন লোড-আনলোডের নিয়ম-নীতির বালাই নেই। তাছাড়া ফেরিতে ওঠানামার সংযোগ রাস্তাটি অধিকতর ঢালু ও খানাখন্দকে ভরা এবং ফেরিতে আগে উঠতে চলে যানবাহনগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা। গত ১৭ বছর এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার দাপটের কারণে ঘাট সংস্কারে উন্নয়ন হয়নি। নদীতে বাস পড়ে যাওয়া ও বছর কয়েক আগে পাটুরিয়াঘাট সংলগ্ন ফেরি ডুবির মতো বড় ধরনের দুর্ঘটনাই অব্যবস্থাপনার রাজসাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে বিআইডব্লিউটিসি এবং বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ ঘাট অব্যবস্থাপনার জন্য একে অপরকেই দায়ী করে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিসির এক কর্মকর্তা জানান, ফেরিঘাটের পন্টুনগুলো রক্ষণাবেক্ষণার জন্য মেরিন ডিপার্টমেন্ট কাজ করে। তারাই বলতে পারবে পন্টুনের ব্যাপারে। তবে প্রত্যেকটি পন্টুনে তিনটি করে পকেট থাকায় ফেরিগুলোতে যানবাহন উঠতে গেলে টার্নিং হয়ে উঠতে হয়। এ কারণে পন্টুনে একটু উচ্চতর রেলিং থাকলে ফেরিতে যানবাহন লোড-আনলোড হতে কোনো ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকতো না। এ দায়িত্ব মেরিন ডিপার্টমেন্টের। তাছাড়া ফেরিতে যানবাহন লোড-আনলোডের সংযোগ রাস্তাগুলো একেবারেই নাজুক। প্রথমত সংযোগ রাস্তায় ঢাল বেশি। পাশাপাশি খানাখন্দক থাকায় যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠতে গিয়ে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। বিআইডব্লিউটিএ’র এক্সচেঞ্জ রবিউল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ফেরিতে ওঠানামার সংযোগ রাস্তাগুলো খানাখন্দকে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ, ওভারলোড যানবাহনগুলো এই রাস্তা দিয়ে ফেরিতে লোড-আনলোড করা হচ্ছে। এজন্য বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষই দায়ী। যদি ওভারলোড কোনো যানবাহন চলাচল না করে তাহলে সংযোগ রাস্তায় ঢাল বেশি হলেও কোনো সমস্যা নেই। ওভারলোড যানবাহনগুলোই সংযোগ রাস্তাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করে যাচ্ছে। তাছাড়া বর্ষাসহ বিভিন্ন সময় ফেরিঘাটের পন্টুন স্থানান্তর করার কারণে সংযোগ রাস্তাগুলো স্থায়ীভাবে পাকা করে ব্যবহার করা যায় না।

বিআইডব্লিউটিসি’র আরিচা অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম আব্দুস সালাম মানবজমিনকে বলেন, আমাদের বিআইডব্লিউটিসির কাজ হচ্ছে ফেরি সার্ভিস সচল রাখা। ফেরিতে ওঠানামার সংযোগ রাস্তা এবং ফেরিঘাটের পন্টুনের রক্ষা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের দপ্তরের নয়। পাটুরিয়া ঘাটে মোট পাঁচটি ফেরিঘাট থাকলেও পদ্মা সেতু হওয়ার পর এই নৌরুট দিয়ে যানবাহন চলাচল কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক সময়ে তিনটি ঘাট ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পন্টুন এবং ডাইভারশন রাস্তার কোনো অব্যবস্থাপনা থাকলে বিআইডব্লিউটিএ এবং মেরিন ডিপার্টমেন্ট ভালো বলতে পারবে। এদিকে মেরিন ডিপার্টমেন্টের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল আল মামুনের সঙ্গে পন্টুনের বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

 

৩ মন্ত্রীর শোক এবং হুঁশিয়ারি: দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে গিয়ে প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। দুর্ঘটনায় নিহতের পেছনের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া, ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট সকলকে সর্বোচ্চ সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। শোকবার্তায় মন্ত্রী বলেন, এই দুর্ঘটনায় ঝরে যাওয়া প্রতিটি প্রাণ শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো জাতির জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসানের সাফ কথা। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে এই কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে যদি পন্টুনের কোনো ত্রুটি বা কারও বিন্দুমাত্র অবহেলা প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কোনো আপস করবে না। এ ছাড়া দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বলেন, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের গভীরভাবে শোকাহত করেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেছেন, দুর্ঘটনার পেছনে কারও গাফিলতি বা যান্ত্রিক অবহেলা থাকলে, তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া দুর্ঘটনার পর তিনি সরাসরি উদ্ধার অভিযান পর্যবেক্ষণ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।

এদিকে বিআইডব্লিউটিসি’র চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, বাসটি ব্রেক ফেল করেছিল। এ ছাড়া ফেরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই চালক ভুলবশত পন্টুনে চলে আসেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।

যাত্রী নিরাপত্তা: এখন থেকে ফেরিতে ওঠার আগেই বাস থেকে সব যাত্রীকে নামাতে হবে। শুধু চালক গাড়ি নিয়ে ফেরিতে উঠবেন। প্রতিটি পন্টুনে শক্ত রেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে যেন নিয়ন্ত্রণ হারালেও গাড়ি নদীতে না পড়ে।