Image description
গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে তীব্র বিরোধ, শেষ পর্যন্ত কী হবে

তিন ইস্যুতে কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। এগুলো হচ্ছে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বৈত শপথ, গণভোটের বাস্তবায়ন ও অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ। এ তিন ইস্যু নিয়ে রাজনীতির অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, যুক্তি-পাল্টা যুক্তি। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে রাজপথে নামার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি বিষয়গুলো নিয়ে আরও আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে বিদ্যমান সংবিধান মেনে চলার শর্ত। সব মিলিয়ে এ তিন ইস্যুর সমাধানে জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট নাকি বিদ্যমান সংবিধান, কোনটা বেছে নেওয়া হবে, তা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের জোটের মূল বিরোধ।

নবনির্বাচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শুরুতেই এসব ইস্যু নিয়ে মেঘ জমতে শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করা নিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিরোধ। বিশেষ করে ‘গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫’ বাতিল বা বহাল রাখা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দল এখন মুখোমুখি অবস্থানে। সংসদীয় বিশেষ কমিটির দুই দিনের ম্যারাথন বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১২০টির বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। তবে বাকি ১৩টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর অধ্যাদেশ নিয়ে এখনো কোনো সমাধান আসেনি। এর মধ্যে রয়েছে গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশ এবং পুলিশ কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ।

বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন জানিয়েছেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে ২৯ মার্চ রাত সাড়ে ৮টায় পুনরায় বৈঠকে বসবে কমিটি। কমিটিকে ২ এপ্রিলের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে সরকার যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা সংশোধন করে, তবে সংসদের ভিতরে ও বাইরে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজপথে নামতে পারে। শেষ পর্যন্ত আপস নাকি সংঘাত, কোন পথে হাঁটবে সংসদ, তা জানতে ২৯ মার্চের বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছে গোটা দেশ।

১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হওয়া গণভোটে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছিল বড় একটি অংশ। তবে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এ গণভোট অধ্যাদেশটি বাতিলের প্রস্তাব করেছে। সরকারের যুক্তি হলো, যে রাষ্ট্রপতির আদেশের ভিত্তিতে এ অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল, তার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এ প্রস্তাবের কঠোর বিরোধিতা করছে। তাদের দাবি, গণভোটের মাধ্যমেই জনগণ তাদের রায় দিয়েছে, তাই এ অধ্যাদেশ বাতিল করা জনগণের ম্যান্ডেটের অপমান।

এদিকে নির্বাচনে জয়ী দলগুলোর মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এমনকি মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জনের মতো নজির স্থাপন হয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সচিবালয়ের শপথকক্ষে নির্বাচিত এমপিরা শপথ নেন। বিদ্যমান সংবিধানে না থাকায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বিএনপি ও তাদের শরিকরা। অন্যদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে থাকায় একই সঙ্গে দুই শপথ নিয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট। বিষয়টি নিয়ে দুই জোটের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন আইনি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এ দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে চলমান সংসদ অধিবেশন উত্তপ্ত হতে পারে। এ নিয়ে দুই জোটের এমপিরা প্রস্তুতিও নিয়েছেন।

সরকারদলীয় দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী (আইন ও স্বরাষ্ট্র) সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, জুলাই সনদ ও সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। অন্যদিকে বিশেষ কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, ‘টু-থার্ড মেজরিটির দোহাই দিয়ে অতীতের সরকার অনেক কিছু করেছে। কিন্তু সেই অহংকার কোনো জাতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। জনগণের স্বার্থপরিপন্থি কোনো বিষয়ে আমরা একমত হব না।’ তিনি বলেন, ‘যে সংস্কার ও বিচারের ম্যান্ডেট নিয়ে এই সরকার এসেছিল, গুম কমিশন বা মানবাধিকার কমিশনের মতো সেই অর্জনগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করা জনগণ মেনে নেবে না। কোনো আইন বেআইনি কি না, তা আদালত নির্ধারণ করবেন। কিন্তু সচল কোনো আইন বা অধ্যাদেশকে একতরফা বাতিল করার প্রস্তাব আমরা গ্রহণ করিনি।’

আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুলাই সনদ আমাদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ দলিল। এর ৩ নম্বর পেজের ৬-এর ক ধারা অনুযায়ী, সনদের ৮৪টি আর্টিকেলের মধ্যে ১ থেকে ৪৭ পর্যন্ত অংশ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। যারা একে বাইপাস করে ভিন্ন কোনো আদেশ দিতে চায়, তারা সনদের পরিপন্থি কাজ করছে। আমরা সংবিধান ও জুলাই সনদকে প্রাধান্য দিয়েই সব পদক্ষেপ নিচ্ছি।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সংবিধান ও জুলাই সনদকে গুরুত্ব দিয়েছি। বিশেষ করে “জুলাই সুরক্ষা”সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশের বিষয়ে সব সদস্য একমত হয়েছেন এবং এগুলো হুবহু সংসদে উপস্থাপন করা হবে। অধ্যাদেশ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে “জুলাই জাতীয় সনদ” এবং “সাংবিধানিকতা” এ দুই বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’