Image description
প্রতিদিন গড়ে ২৭ প্রাণহানি, বেপরোয়া গতি ফিটনেসবিহীন যান ও অদক্ষ চালক প্রধান কারণ দুর্ঘটনা বাড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা

আট বছরের শিশু আলিফ। মায়ের হাত ধরেই যার পৃথিবী। ঈদের সকালে মায়ের হাতে তৈরি সেমাই খেয়ে দিন শুরু করেছিল সে। কিন্তু এটাই যে মায়ের সঙ্গে তার শেষ ঈদ, তা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ছোট্ট শিশুটি। ২৫ মার্চ ঢাকায় ফেরার পথে দৌলতদিয়া ঘাটে তাদের বহনকারী বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। নিজের জীবন বাজি রেখে সন্তানের প্রাণ বাঁচালেও নদীর অতল গহ্বরে হারিয়ে যান মা জ্যোৎস্না বেগম। এক দুর্ঘটনায়ই নিভে যায় বহু পরিবারের আলো-কেউ সন্তানহারা, কেউ স্বামীহারা, আবার কেউ হয়ে যায় এতিম।

ঈদযাত্রা এলেই যেন সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল দীর্ঘতর হয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের ঈদুল ফিতর কেন্দ্র করে ১৭ থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত ১০ দিনে দেশে ৩৪২ সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৭৪ জন নিহত হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ঝরেছে ২৭ প্রাণ। গত বছর একই সময়ে ২৪৯ জন নিহত হয়। জ্বালানি সংকটে এবার সড়কে মোটরসাইকেল কম থাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ছিল কম। তবে আশঙ্কজনকভাবে বাড়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনা। শুধু সড়ক নয়, রেল ও নৌপথেও ঘটেছে একের পর এক দুর্ঘটনা। ১৮ মার্চ বগুড়ার সান্তাহারে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়। ২১ মার্চ কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষে প্রাণ যায় ১২ জনের। ২৫ মার্চ দৌলতদিয়ায় নদীতে বাস ডুবে মারা যায় ২৬ জন। সদরঘাটে নৌকা থেকে লঞ্চে উঠতে গিয়ে দুজন নিহত হন দুই লঞ্চের চাপায় পড়ে। গত পরশু কুমিল্লায় বাসের ধাক্কায় প্রাইভেট কারের পাঁচ যাত্রীর (চালকসহ) মৃত্যু হয়। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ট্রেনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। পুলিশ সদর দপ্তরের গবেষণায় উঠে এসেছে, বেপরোয়া গতি সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪২ শতাংশ। ঈদের সময় অতিরিক্ত যাত্রীচাপ, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া এবং চালকদের অতিরিক্ত ট্রিপ নেওয়ার প্রবণতা দুর্ঘটনা বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান বলেন, ‘সড়কে নিরাপত্তাসংকট দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল। আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক এবং নজরদারির অভাব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলছে। আইন অমান্য করলে কোনো শাস্তি হয় না। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও শাস্তির ভয় না থাকায় কেউ আইন মানছে না। শুধু সংঘর্ষ নয়, নিয়ন্ত্রণ হারিয়েও দুর্ঘটনা ঘটছে। কারণ কী? হয় দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে, নয়তো গাড়িটির ফিটনেস ছিল না। এগুলো দেখার জন্য প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু তারা দেখছে না। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার প্রতিনিয়ত মিটিং করে, নানান সুপারিশও আসে; কিšুÍ বাস্তবায়ন হয় না। যতদিন সরকার আন্তরিক না হবে, সড়ক আইন প্রয়োগে কঠোর না হবে ততদিন সংকট কাটবে না।’ বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেসব প্রতিবেদন ধামাচাপা পড়ে যায়। প্রতিবেদনের কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না।’ তিনি বলেন, ‘ঈদে অতিরিক্ত ট্রিপের চাপে চালকরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম পান না, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। আমরা বহুদিন ধরে চালকদের দিয়ে ৮ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালানোর দাবি করে আসছি। কেউ শুনছে না।’ মোজাম্মেল হক জানান, ঈদের ছুটিতে বড় কোম্পানির এক বাসের চালক তাঁকে বলেন, ব্রেক সমস্যার কারণে কিছুদিন ধরে তাঁর বাসটি নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হচ্ছে। মালিককে বললে তিনি চাঁদরাত পর্যন্ত কষ্ট করে চালিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করারও উপায় নেই, চাকরি থাকবে না। মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এই বাস দুর্ঘটনায় পড়লে দায় কার? এসব নানান কারণেই দুর্ঘটনা বেড়েছে। এবার ঈদে সড়কে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান বন্ধ করতে পারিনি। নির্ধারিত ভাড়া মানানো যায়নি। অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তা থেকে সরানো যায়নি। বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা মূল সড়কে চলেছে। হাসপাতালে এবার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহতদের চেয়ে তিন গুণ ছিল অটোরিকশা দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যা।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশে চালক প্রশিক্ষণব্যবস্থায় গুরুতর ত্রুটি রয়েছে। ড্রাইভিং স্কুলগুলো কেবল গাড়ি চালানোর প্রাথমিক কৌশল শেখায়, কিন্তু সড়ক আইন ও কারিগরি জ্ঞান শেখায় না। ফলে তৈরি হচ্ছে অদক্ষ চালক। আর এ অদক্ষ চালকরাই সড়কে সৃষ্টি করছেন বিশৃঙ্খলা। এ ছাড়া অনেক হেলপার চালকের সঙ্গে থাকতে থাকতেই স্টিয়ারিং হাতে তুলে নেন।’

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর হিসাবে, দেশে প্রতি বছর ৫ হাজারের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং আহত হয় প্রায় ১০ হাজার। তবে হাসপাতালভিত্তিক তথ্য যুক্ত হলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। মোজাম্মেল হকের মতে দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ ১০ ভাগ তাঁদের প্রতিবেদনে উঠে আসে। কারণ ছোটখাটো অনেক ঘটনা গণমাধ্যমে আসে না। সেভ দ্য রোড-এর মহাসচিব শান্তা ফারজানা বলেন, ‘ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালক কীভাবে সড়কে চলাচল করে-এ প্রশ্নের জবাব দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। দুর্ঘটনায় আহতের অন্তত ৭০ ভাগ স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করছে, অথচ তাদের পুনর্বাসনে নেই কার্যকর উদ্যোগ। আলোচিত ঘটনাগুলোয় ভুক্তভোগীরা কিছু সহায়তা পেলেও অধিকাংশ দুর্ঘটনায় হতাহতরা রাষ্ট্রের কোনো সহযোগিতা পায় না। অথচ রাষ্ট্রের অবহেলাতেই এসব দুর্ঘটনা।’

বিশেষজ্ঞদের মতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর আইন প্রয়োগ, চালক প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া মৃত্যুর এই মিছিল থামানো সম্ভব নয়।

দুজনের খোঁজে ফের তল্লাশি : রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাসডুবির ঘটনায় তৃতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে। গতকাল সকাল সোয়া ৮টা থেকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের একটি করে দল উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, রিপন নামে একজন ইটভাটার শ্রমিক নিখোঁজের তথ্য রয়েছে। সেই তথ্যের আলোকে অভিযান পরিচালনা করছি। দুর্ঘটনার স্থানসহ বিভিন্ন জায়গায় উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে। জানা যায়, ঘটনার দিন রাজবাড়ী থেকে রিপন শেখ (২৫) নামে এক ব্যক্তি ঢাকার উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন। তার বোন স্বপ্না দাবি করেছেন, রিপন সৌহার্দ্য পরিবহনে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। এ ছাড়া বাসটির হেলপার হালিম প্রামাণিকও (৩৮) নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার কালিতলা গ্রামের বাসিন্দা। রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, বাসডুবির ঘটনায় ২৬ জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে আছে।

এর আগে বুধবার বিকালে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে অর্ধশত যাত্রী নিয়ে একটি বাস ডুবে যায়। এ পর্যন্ত ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১ জন নারী, সাতজন পুরুষ ও আট শিশু।

কাজ শুরু করেছে তদন্ত কমিটি : নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম জানান, চলন্ত ট্রেনে আগুন ধরার ঘটনায় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের গঠিত কমিটি প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে কাজ শুরু করেছে। গতকাল থেকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করছেন। আগামী তিন দিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট বিএমএ গেট এলাকায় চলন্ত অবস্থায় ঢাকা অভিমুখী ‘চট্টলা এক্সপ্রেস’ ট্রেনে আগুন ধরে। পরে আগুন পাশের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) কোচে ছড়িয়ে পড়ে। এতে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা দ্রুত ট্রেন থেকে নেমে নিরাপদ স্থানে সরে যান। পরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি ইউনিট ফৌজদারহাট থেকে ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে ট্রেনের দুটি কোচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার সময় ১৬টি বগির ওই ট্রেনে ৬০০ জনেরও বেশি যাত্রী ছিলেন। আগুনে পুড়ে যাওয়া পাওয়ার কার (বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বগি) ও ক্ষতিগ্রস্ত একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগি রেখেই ট্রেনটি ঢাকা চলে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত বগি দুটিকে রেলের মেরামত কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তাকে (ডিটিও) প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, ট্রেনটি ছাড়ার মাত্র ২০ মিনিট পর, ১২ কিলোমিটার পথ যাওয়ার পরই আগুন লাগল। তাহলে কি ট্রেনটির ফিটনেস চেক না করেই ছাড়া হয়েছিল? তদন্ত প্রতিবেদনে এসব প্রশ্নের উত্তর কি আসবে? বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, চট্টলা এক্সপ্রেসে আগুনের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি গতকাল থেকে কাজ শুরু করেছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে তারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। প্রতিবেদন প্রকাশ হলেই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন হবে। ডিটিও আনিসুর রহমান বলেন, ট্রেনের পাওয়ার কার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে পরে তা একটি এসি কোচেও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আগুন ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আগেই যাত্রীরা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হন। তবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।