Image description

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত তরুণ জনগোষ্ঠীই এখন ক্রমে একটি কাঠামোগত সংকটের মুখে পড়ছে। দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি, শিক্ষিত বেকারত্বের বিস্তার এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার অসামঞ্জস্য—এই তিনের সম্মিলিত প্রভাবে বিনিয়োগ পরিবেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি উৎপাদনশীলতার ওপরও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ বর্তমানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ—কোনোটিতেই যুক্ত নয় (নিট), যা বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি ১৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত হতে পারত। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই তরুণদের একটি বড় অংশ শ্রমবাজারে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারছেন না। সরকারি হিসাবে যুব বেকারত্বের হার ৮.০৭ শতাংশ হলেও শিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এই হার অনেক বেশি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮.২৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

জিইডির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে যে বেকার জনগোষ্ঠী রয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৯ লাখই বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও তাঁরা শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারছেন না। এটি ‘ক্রেডেনশিয়াল ইনফ্লেশন’-এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ, যেখানে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়লেও তার বাজারমূল্য কমে যাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ৭.৫ লাখ নতুন গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, যার মধ্যে প্রায় ৪.৫ লাখই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত দুই হাজার ২০০টি কলেজ থেকে পাস করছেন।

কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।

একই সময়ে শিল্প খাতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল (এসটিইএম) এবং তথ্য-প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী না পেয়ে উৎপাদন সম্প্রসারণে দ্বিধায় পড়ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ‘স্কিল গ্যাপ’ দেশের সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের ক্ষেত্রেও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার দ্রুত বাড়লেও শিক্ষা কার্যক্রমের মান ও প্রাসঙ্গিকতা শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত হয়নি। অন্যদিকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার (টিভিইটি) প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বর্তমানে মোট শিক্ষা বাজেটের মাত্র ৪.৬ শতাংশ এই খাতে ব্যয় হয়, যেখানে বাস্তবে এই খাতেই কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বেশি।

এ ছাড়া শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগও ধারাবাহিকভাবে কমছে। জিডিপির অনুপাতে শিক্ষায় ব্যয় ২০২১-২২ অর্থবছরের ২.০৮ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১.৬৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এর বিপরীতে, দেশীয় শিক্ষার মান নিয়ে আস্থাহীনতার কারণে গত ৯ বছরে বিদেশে পড়াশোনার পেছনে বাংলাদেশি পরিবারগুলো প্রায় দুই-তিন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।

তরুণদের এই কর্মসংস্থান সংকট কেবল অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সামাজিক প্রভাবও ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, যাদের ৮০ শতাংশই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। একইভাবে অনলাইন জুয়ায় যুক্ত রয়েছেন ৫০ লাখের বেশি তরুণ, যা ২০২৭ সালের মধ্যে দুই কোটিতে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক হতাশা তরুণদের এই ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশমুখী প্রবণতা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রায় ৫৫ শতাংশ তরুণ বিদেশে কাজের সুযোগ খুঁজছেন। তবে দক্ষতার ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও তাঁরা কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে পারছেন না, যা ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এমন প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছে জিইডি। তারা ‘হোল-অব-গভর্নমেন্ট’ পদ্ধতিতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে সমন্বিত সংস্কারের আহবান জানিয়েছে। উচ্চশিক্ষায় মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।