দেশের অর্থনীতিতে গত এক দশকে এক ধরনের নীরব কিন্তু গভীর বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বরং উৎপাদন ও সেবা খাত—যেগুলোকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়, সেই দুই খাতেই কর্মসংস্থান কমেছে। অর্থনীতিবিদরা এই প্রবণতাকে ‘চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন— যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।
প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের বিচ্ছিন্নতা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে দেশের জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অবদান প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে— যা শিল্পায়নের অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি শ্রমবাজারে প্রতিফলিত হয়নি। একই সময়ে উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমেছে ২.২ শতাংশ পয়েন্ট।
সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে ২.৬ শতাংশ পয়েন্ট। অপরদিকে কৃষি খাতে জিডিপিতে অবদান কমলেও কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪.৮ শতাংশ পয়েন্ট।
আইএমএফের ভাষ্য অনুযায়ী, শিল্প ও সেবা খাত পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারায় কৃষি খাত এক ধরনের ‘বাফার’ হিসেবে অতিরিক্ত শ্রমশক্তিকে শোষণ করছে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা কমিয়ে অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বিনিয়োগে স্থবিরতা: সংকটের কেন্দ্রবিন্দু
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ নেমে এসেছে ২২.০৩ শতাংশে— যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
অর্থবছরটিতে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট বিনিয়োগ হয়েছে ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।
এই বিনিয়োগ স্থবিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩.৪৯ শতাংশে— যা করোনাকালের পর সর্বনিম্ন। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি— সব ক্ষেত্রেই গতি কমে গেছে।
শ্রম উৎপাদনশীলতায় বড় ঘাটতি
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত “বাংলাদেশ স্টেট অব দ্য ইকোনমি ২০২৫” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের শ্রম উৎপাদনশীলতা এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
২০২৫ সালে প্রতি ঘণ্টায় উৎপাদনশীলতা— বাংলাদেশ: ৮.৭ ডলার, ভিয়েতনাম: ১২.৪ ডলার, ভারত: ১০.৭ ডলার, শ্রীলঙ্কা: ১৮ ডলার, চীন: ১৯.৮ ডলার, জিইডির তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মসংস্থান এখনও অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে উৎপাদনশীলতা কম। ফলে শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হচ্ছে না।
কম উৎপাদনশীলতার ফলে মজুরি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, পারিবারিক আয় বাড়ছে ধীরগতিতে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব: বাড়ছে বৈপরীত্য
শ্রমবাজারের এই সংকট সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে। পরিসংখ্যান বলছে— উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্ব: ২৫ শতাংশ,
সামগ্রিক বেকারত্ব: ৩.৬৯ শতাংশ, তরুণ বেকারত্ব: ৮.৪৯ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্ব ১৬.৬৬ শতাংশ, যা পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অমিল এই সংকটের অন্যতম কারণ। ফলে একদিকে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি থাকছে, অন্যদিকে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারত্ব।
উৎপাদন বাড়ছে, চাকরি নয়
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ক্রমেই শ্রমনির্ভরতা হারিয়ে পুঁজিনির্ভর হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে র্যাপিড ও এফইএস বাংলাদেশের যৌথ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শিল্প খাতে উৎপাদন গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়লেও কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ১৪ লাখ। এ সময়ে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান ৯৫ লাখ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ লাখে।
তৈরি পোশাক খাতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রফতানি ১২.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও কর্মসংস্থান প্রায় ৪০ লাখেই স্থির রয়েছে। একইসঙ্গে প্রতি ১০ লাখ ডলার রফতানিতে প্রয়োজনীয় শ্রমিক সংখ্যা ৫৪৫ জন থেকে কমে ৯০ জনের নিচে নেমে এসেছে— যা অটোমেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের প্রভাব নির্দেশ করে।
নারী শ্রম অংশগ্রহণেও বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। গত একদশকে উৎপাদন শিল্পে নারী কর্মীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘চতুর্মুখী আক্রমণের ফল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা— এই চারটি কারণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরির মতে, শিক্ষাব্যবস্থা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে দক্ষতার ঘাটতি ও শিক্ষিত বেকারত্ব একই সঙ্গে বাড়ছে। অটোমেশনের ফলে নিম্ন দক্ষতার চাকরি কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই সংকট আরও বাড়তে পারে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘‘গত দুই দশকের প্রবৃদ্ধির সাফল্যে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছে। ফলে কর্মসংস্থান বিষয়টি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি।’’ তিনি উল্লেখ করেন, কৃষিতে ৪৫ শতাংশ শ্রমশক্তি নিয়োজিত থাকলেও জিডিপিতে এর অবদান মাত্র ১১ শতাংশ— যা কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার বড় উদাহরণ।
বিনিয়োগ ও আস্থার সংকট
বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদের হার ১৩-১৪ শতাংশে পৌঁছানোয় নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ করহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং লজিস্টিক দুর্বলতা বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও দুর্বল করছে।
বিদেশি বিনিয়োগও নেমে এসেছে পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে— যা প্রযুক্তি স্থানান্তর ও উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সীমিত করছে।
করণীয় ও সামনে চ্যালেঞ্জ
সব বিশ্লেষণ একত্রে ইঙ্গিত দিচ্ছে—বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রবৃদ্ধিকে কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা যে করণীয়গুলো উল্লেখ করছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে স্থিতিশীল নীতি ও আস্থার পরিবেশ তৈরি।
শিল্প খাতে বৈচিত্র্য আনা। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ জোরদার। শিল্প ও শিক্ষার মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি। লজিস্টিক ও অবকাঠামো উন্নয়ন। প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ।
উল্লেখ্য, গত এক দশকের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে যে, শুধু প্রবৃদ্ধি দিয়ে কর্মসংস্থান সংকট সমাধান সম্ভব নয়। উৎপাদন ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান না বাড়লে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। এই বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রবৃদ্ধি কি মানুষের জন্য কাজ করবে, নাকি কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নীতিনির্ধারকদের জন্য এটাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।