বিদেশি সহায়তা নীতিতে এক যুগে বাংলাদেশকে দেড় হাজার কোটি রুপির অর্থ সহায়তা দিয়েছে ভারত। তবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত ১২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম অর্থ সহায়তা এসেছে। পাঁচ বছর আগেও যেখানে বছরে ২০০ কোটি রুপির বেশি অর্থ দিয়েছিল ভারত। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা ২৫ কোটি রুপিতে নেমে এসেছে, যা গত এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন।
গত শুক্রবার ভারতের লোকসভা অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং বাংলাদেশকে দেওয়া অর্থ সহায়তার তথ্য জানিয়েছেন। সেই অর্থ সহায়তার হিসাব থেকে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
লোকসভার সদস্য টি আর বালু ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে এই পর্যন্ত কী পরিমাণ সহায়তা বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে, তা জানতে চান। লিখিত উত্তরে অর্থ সহায়তার তথ্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে লোকসভায় বাংলাদেশকে দেওয়া অর্থ সহায়তার হিসাবের কথা জানানো হয়েছে। তবে এই হিসাবে ভারতের লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় আসা অর্থ বাদ দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, লোকসভায় ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিবেশীকেন্দ্রিক ও জনমুখী। ভারত এলওসি ও অনুদানের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগে সহায়তা প্রদান করেছে।
কত দিল ভারত
২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বাংলাদেশকে কোন অর্থবছরে কত দেওয়া হয়েছে, সেই হিসাব লোকসভায় দেওয়া হয়েছে। ভারতের অর্থবছর এপ্রিল মাস থেকে মার্চ পর্যন্ত।
গত এক যুগে ভারত সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৫৫৭ কোটি রুপি দিয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ১৯৮ কোটি রুপি দেওয়া হয়।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত (ভারতের অর্থবছরের ১১ মাসের হিসাব) মাত্র ২৫ কোটি রুপি আসে। গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে ভারতীয় অর্থ সহায়তা আট ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং লোকসভায় বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশ গভীর ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত এবং সামাজিক সম্পর্ক আছে। একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি ভারত ধারাবাহিকভাবে সমর্থন প্রকাশ করেছে। দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অধীনে উচ্চপর্যায়ের বিনিময় ও বৈঠক অব্যাহত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কীর্তি বর্ধন সিং আরো বলেন, ভারতীয় বন্দরগুলোতে দেওয়া সুবিধার বিষয়ে বাংলাদেশ নিজস্ব রপ্তানিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট সব বিষয় বিবেচনা করে নীতিতে যেকোনো পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এলওসিতে কত এলো
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ভারত সব মিলিয়ে এলওসির আওতায় ২১০ কোটি ডলার ছাড় করেছে। ২০১০, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তিনটি এলওসিতে বাংলাদেশকে মোট ৭৩৬ কোটি ডলার ঋণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতির পরও কাঙ্ক্ষিত হারে অর্থছাড় হয়নি।
অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ—এসব খাতের প্রকল্পই বেশি নেওয়া হয়েছে। ২০১০ সালে প্রথম এলওসিতে ১০০ কোটি ডলার দেয়। প্রথম এলওসিতে ১৫টি প্রকল্প ছিল। এর মধ্যে ১২টি প্রকল্প শেষ হয়েছে, বাকি তিনটি চলমান। দ্বিতীয় এলওসিতে নেওয়া ১৫টি প্রকল্পের মধ্যে দুটি শেষ হয়েছে, ১০টি চলমান ও ৩টি প্রকল্প প্রস্তাবনা পর্যায়ে আছে। তৃতীয় এলওসির ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে ৮টি চলমান আছে এবং বাকি ৫টি প্রস্তাবনা পর্যায়ে আছে।
ইআরডির একজন কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর ভারতীয় ঋণের ছাড় কমেছিল। তবে নতুন সরকার আসার পর এলওসির আওতায় প্রকল্পগুলোর অর্থ ছাড়ে সমস্যা কোথায়, তা নিয়ে পর্যালোচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।