রাত ৩টা বাজে। ট্রেনের কেবিনে ঘুমিয়ে ছিলাম, হঠাৎ শুনতে পেলাম একটি বিকট শব্দ, প্রথমে মনে করেছিলাম ট্রেনের চাকার হয়তো যান্ত্রিক ত্রুটি, কিন্তু একটু পরই শুনতে পেলাম চিৎকার আর আর্তনাদ। কেবিন থেকে বের হয়ে দরজার কাছে এসে দেখি বাঁচাও বাঁচাও শব্দ কেউ কেউ। অন্ধকার হওয়ায় ট্রেনের সামনে যে বাস ঝুলে আছে সেটি আমরা প্রথমে বুঝতে পায়নি, প্রায় ৩ মিনিট পর ট্রেনটি যখন থামল নিচে নেমে এসে দেখি এদিক-সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লাশ আর লাশ।
মোবাইলের আলোতে দেখলাম রেললাইনের পাত ও পাথরগুলোতে রক্তে ছোপ ছোপ দাগ। কেউ আর্তনাদ করছেন আমাকে ধরেন, কেউ বলছে ভাই আমাকে বাঁচান, চোখের সামনে দেখলাম কয়েকজন ছটফট করতে করতে মারা গেছে। এদের কারো পা নেই, কারো মাথা নেই, কারো শরীর অর্ধেক অংশই নেই। এমন দৃশ্য দেখে কাকে ছেড়ে কাকে ধরব, কী করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
রবিবার (২২ মার্চ) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার এলাকার দুর্ঘটনাকবলিত বাসের সামনে দাঁড়িয়ে কালের কণ্ঠকে এভাবেই বলছিলেন ট্রেনের যাত্রী মো. তৌহিদুল ইসলাম। তৌহিদুল ইসলাম ট্রেনে করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের একটি মাদরাসায় শিক্ষকতা পেশায় জড়িত।
এর আগে শনিবার রাত ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ারবাজার রেলক্রসিংয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা অভিমুখে আসা ঢাকা মেইল ট্রেনের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা মামুন স্পেশাল বাসের সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। ইতোমধ্যে নিহতের লাশ শনাক্তের পর কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে ১১টি অ্যাম্বুল্যান্সে করে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে পৃথক রেল মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ট্রেনের যাত্রী তৌহিদুল ইসলাম আরো বলেন, এমন হৃদয় বিদারক দৃশ্য আর কখনো দেখিনি, যা বর্ণনা করার মতো না।
এদিকে আজ রবিবার বিকাল ৩টার দিকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে মামুন পরিবহনের যাত্রী অন্তত ১৫-১৮ জনকে বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে একজনকে আইসিউতে রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনাকবলিত মামুন পরিবহন বাসের যাত্রী ওমর ফারুক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুর্ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি বাসের পেছনে সিটে বসা ছিলাম। কিছুক্ষণ আগে বাসটি যাত্রাবিরতি দেয়। এরপর বিরতি শেষে আমি সিটে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়ি। কুমিল্লায় এরিয়া যখন পার হচ্ছিল তখন বাসটি হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে ঝাঁকি দেয় ও বিকট শব্দ হয়, আমার ঘুম ভাঙতেই দেখি ট্রেন বাসটিকে মুখে করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাসের ভেতরে তখন সবাই বাঁচার আকুতি করছিলেন। এরপর দু-এক মিনিটের মধ্যেই বাসের ভেতরটি দুমড়েমুচড়ে যায়। চোখের সামনেই কয়েকজনকে ছটফট করে মারা যেতে দেখি, এরপর তিনি আর কিছু বলতে পারেনি।
এ ঘটনায় অন্তত আরো ১৫ থেকে ১৮ জন আহত যাত্রীকে কুমেকসহ নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা হচ্ছে বলে কালের কণ্ঠকে জানান জেলা সিভিল সার্জন ডা.আলী নুর মোহাম্মদ বশীর। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, নিহতদের স্বজনরা হাসপাতালে এসে মরদেহ শনাক্ত করেছেন। মরদেহগুলো তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর যারা আহত হয়েছে তাদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।