দীর্ঘ দুই বছরের অচলাবস্থা কাটিয়ে অবশেষে সচল হতে যাচ্ছে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। গত ১৩ মার্চের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রাজস্ব বণ্টন ও যাত্রী প্রতি চার্জ (এম্বারকেশন ফি) নিয়ে ঢাকা ও টোকিও’র মধ্যে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, সব প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে এই টার্মিনাল।
চার্জ নিয়ে রশি টানাটানি ও সমঝোতা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাওয়া জাপানি অপারেটর শুরুতে প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ১২ ডলার (প্রায় ১,৫০০ টাকা) চার্জ আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। বর্তমানে শাহজালালে এম্বারকেশন চার্জ সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা হওয়ায় ঢাকার পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর গত ১৩ মার্চের বৈঠকে বাংলাদেশ ৮ ডলারের বেশি চার্জ না রাখার পক্ষে যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করলে জাপান নমনীয় মনোভাব প্রকাশ করে। তারা এখন একটি সংশোধিত (রিভাইজড) প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এ বিষয়ে বলেন, “তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা সংক্রান্ত চুক্তিতে কয়েকটি চার্জ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কিছু জটিলতা ছিল। এসব বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। সিভিল এভিয়েশন সংক্রান্ত চুক্তিতে সাধারণত তিন ধরনের চার্জ থাকে। এসব চার্জের কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ পক্ষ তাদের প্রস্তাব দিয়েছে এবং জাপানও তাদের প্রস্তাব তুলে ধরেছে।”
চালুর সময়সীমা
বেবিচক আশা করছে, জাপানের প্রস্তাব পাওয়ার পর আগামী মাসেই কার্যাদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। কার্যাদেশ দেওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রকল্প দ্রুত চালুর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ায় থার্ড টার্মিনাল নিয়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটতে শুরু করেছে।
টার্মিনালের সক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা
দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই থার্ড টার্মিনালটি দেশের এভিয়েশন খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। বর্তমানে বিমানবন্দরের প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল দিয়ে বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হলেও, ৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটারের এই নতুন টার্মিনাল যুক্ত হলে বছরে প্রায় ২ কোটি যাত্রী বিশ্বমানের সেবা পাবেন। এখানে একসঙ্গে ৩৭টি উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য: টার্মিনাল ভবনের ভেতরে ব্যবহৃত হয়েছে পৃথিবীর অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি। দীর্ঘ পথ হাঁটতে অক্ষম যাত্রীদের জন্য সিঙ্গাপুর বা ব্যাংকক বিমানবন্দরের মতো এখানে স্থাপন করা হয়েছে বেশ কিছু ‘স্ট্রেইট এক্সকেলেটর’, যা যাত্রীদের যাতায়াতকে করবে মসৃণ ও আরামদায়ক।
উন্নত ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা: যাত্রীদের মালামাল ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি ও ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের আদলে তিনটি বিশেষ স্টোরেজ এরিয়া—রেগুলার ব্যাগেজ স্টোরেজ, লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড এবং অতিরিক্ত ওজনের (ওড সাইজ) ব্যাগেজ স্টোরেজ। মালামাল সংগ্রহের জন্য ১৬টি নিয়মিত বেল্টের পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগেজের জন্য আরও ৪টি পৃথক বেল্ট স্থাপন করা হয়েছে।
পরিবার ও শিশুসেবা: যাত্রীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে প্রতিটি ওয়াশরুমের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ‘বেবি কেয়ার লাউঞ্জ’। যেখানে মায়েদের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং বুথ, ডায়াপার পরিবর্তনের ব্যবস্থা এবং শিশুদের জন্য স্লিপার-দোলনাসহ একটি সুপরিসর প্লে-এরিয়া রাখা হয়েছে।
স্বয়ংক্রিয় চেক-ইন ও স্বাস্থ্যসেবা: টার্মিনালে থাকছে ১০টি স্বয়ংক্রিয় ‘সেলফ চেক-ইন কিওস্ক’, যেখানে পাসপোর্ট ও টিকিটের তথ্য দিলে নিমিষেই বোর্ডিং পাস ও সিট নম্বর চলে আসবে। এরপর স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতেই যাত্রীর লাগেজ নির্ধারিত বিমানে পৌঁছে যাবে (সর্বোচ্চ ৩০ কেজি)। এছাড়া সাধারণ যাত্রীদের জন্য আরও ১০০টি চেক-ইন কাউন্টার প্রস্তুত রয়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় এখানে ফার্স্ট-এইড রুমের পাশাপাশি হেলথ ইন্সপেকশন ও আইসোলেশন এরিয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিনোদন ও লাউঞ্জ সুবিধা: যাত্রীদের অপেক্ষার সময়কে আনন্দদায়ক করতে দ্রুতই চালু করা হচ্ছে মুভি লাউঞ্জ ও এয়ারলাইনস লাউঞ্জ। অন্যান্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাগুলো ইতোমধ্যে স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে, যা এই টার্মিনালকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা বিমানবন্দরে রূপান্তর করবে।
২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর শাহজালাল বিমানবন্দরের এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের ৯৯ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে এর ‘সফট ওপেনিং’ করা হয়েছিল। তবে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা নিয়ন্ত্রণ এবং আয়ের অংশীদারত্ব নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় গত দুই বছর ধরে এর কার্যক্রম স্থবির হয়ে ছিল। অভিযোগ রয়েছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের একগুঁয়েমি ও আলোচনার অদূরদর্শিতার কারণে একপর্যায়ে জাপান এই প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যায়।
এই জটিল পরিস্থিতিতে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই থার্ড টার্মিনাল দ্রুত চালুর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন এবং জাপানের সঙ্গে পুনরায় ফলপ্রসূ আলোচনার নির্দেশনা প্রদান করেন। তার এই উদ্যোগ ও নির্দেশনার প্রেক্ষিতেই গত শুক্রবার ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যা থার্ড টার্মিনাল চালুর ক্ষেত্রে নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ডিসেম্বরের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে সচল হলে দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন খাতে এক নতুন মাইলফলক স্থাপিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।