ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বেশিরভাগ দেশগুলোতে। এসব দেশের মধ্যে আছে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ১০-১৫টি দেশে যুদ্ধের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ইসরায়েল ও লেবানন হলেও এর প্রভাব বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, ইয়েমেন ও সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে; যেখানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা ঘটছে। এতে করে আটকা পড়ছেন প্রবাসীরা। নতুন যারা কাজে যাবেন তাদেরও বাড়ছে অনিশ্চয়তা। এতে করে সংকটে আছে দেশের একমাত্র শ্রমবাজার।
একমাত্র শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্য
এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য। প্রধান দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, ইয়েমেন, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, তুরস্ক, মিশর, ইসরায়েল, ফিলিস্তিন ও সাইপ্রাস অন্যতম। এই অঞ্চলটি খনিজ তেল ও কৌশলগত অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশে বাংলাদেশ থেকে কর্মী গেলেও সবচেয়ে বেশি যায় সৌদি আরবে।
বিএমইটির তথ্য বলছে, কর্মী পাঠানোর তালিকায় ১৬৮টি দেশের নাম থাকলেও গত বছর বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা ১৪১টি দেশে গেছেন। এর মধ্যে ৯০ ভাগ কর্মী গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। ১৩টি দেশে মাত্র একজন করে কর্মী গেছেন, ৩৪টি দেশে দুই থেকে ১০ জন করে কর্মী গেছেন। ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে।
এছাড়া ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন, লেবানন, কুয়েত, জর্ডানে কর্মী যাওয়া বন্ধ কিংবা অল্প সংখ্যক কর্মী যায়। এর বাইরে মিশর, মরিশাস, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই একেবারে বন্ধ। ইউরোপের বাজারে কর্মী যায় অল্প করে, জাপানেও খুব বেশি কর্মী যেতে পারছে না।
অভিবাসন খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত সৌদি আরবকেন্দ্রিক শ্রমবাজার হওয়ায় যুদ্ধের প্রভাবে এখন বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিকল্প বাজার না থাকায় কর্মী পাঠানো ব্যাহত হচ্ছে; যা অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের শঙ্কা বাড়াচ্ছে। বর্তমানে আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
একের পর এক বাতিল হচ্ছে ফ্লাইট
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সব মিলিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সর্বমোট বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১৪টি।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানায়, যুদ্ধপরিস্থিতিতে আকাশপথ বন্ধের কারণে ঢাকা থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৩টি, ১ মার্চ ৪০টি ফ্লাইট, ২ মার্চ ৪৬টি, ৩ মার্চ ৩৯টি, ৪ মার্চ ২৮টি, ৫ মার্চ ৩৬টি, ৬ মার্চ ৩৪টি, ৭ মার্চ ২৮টি, ৮ মার্চ ২৮টি, ৯ মার্চ ৩৩টি, ১০ মার্চ ৩২টি, ১১ মার্চ ২৭টি, ১২ মার্চ ২৮টি, ১৩ মার্চ ২৫টি, ১৪ মার্চ ২৪টি, ১৫ মার্চ ২৩টি, ১৬ মার্চ ২৮টি, ১৭ মার্চ ২৬টি, ১৮ মার্চ ২৬টি এবং ১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার) ২৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
উদ্বেগে আটকে পড়া কর্মীরা
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে এখন পর্যন্ত পাঁচ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। এর মধ্যে তিন জনই সৌদি আরবে মারা গেছেন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৃত্যু, চাকরি হারানো এবং কাজে না ফিরতে পেরে দেশে ফিরে আসার ভয়ে এখন দিনযাপন করছেন সেসব দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা। একইসঙ্গে উৎকণ্ঠায় আছে দেশে থাকা তাদের পরিবার।
শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণা সেল অকার্যকর
বিএমইটির পক্ষ থেকে ৫৩টি দেশের শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়েছে ২০১৮ সালে। এরপর আর কোনও গবেষণা হয়নি। অনেক বছর ধরে নতুন কোনও শ্রমবাজার তৈরি করা যাচ্ছে না। গত দেড় দশকে ৯৭টি দেশ থেকে বাড়িয়ে ১৬৮টি দেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ দেশেই কর্মী যাচ্ছে হাতে গোনা। অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন সম্ভাবনাময় বাজার ধরতে না পারলে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে দেশের অভিবাসন খাত।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের প্রথম সভায় শ্রমবাজারগুলো বন্ধ হওয়ার কারণ এবং খোলার বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে অভিবাসন ব্যয় কমানোর জন্য মন্ত্রণালয়কে পদক্ষেপ নিতে বলেন।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিসপ্তাহে শ্রমবাজার বিষয়ে হালনাগাদ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেছি। বিদেশি কর্মীর চাহিদা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শতভাগ শ্রম অধিকার ও উচ্চ বেতনের নিশ্চয়তা থাকায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে জাপান বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় একটি শ্রমবাজার। পাশাপাশি এখন থেকে আমাদের মালয়েশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর শ্রমবাজারের দিকে আরও বেশি জোর দিতে হবে আমাদের।
তিনি বলেন, প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে আমরা সবসময় প্রস্তুত আছি। তাদের জন্য সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে। যেকোনও সমস্যা জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে। এছাড়া আমাদের ৪০টি দেশের লেবার উইং থেকে খবর আসে, সেখানে জানালে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।
সৌদি আরবেও ভিসা নিয়ে জটিলতা
সৌদি আরব কর্মী নিয়োগের ভিসা ইস্যু কমিয়ে দিয়েছে। দেশটিতে যাওয়ার পর কর্মীরা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ বা কাজের অনুমতিপত্র (ইকামা) পাচ্ছেন না– এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে করে ইস্যু করা ভিসাও বাতিল হয়ে যাচ্ছে। গত মাসে জমা পড়া কয়েক হাজার আবেদন বাতিল করেছে সৌদি আরবের মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়। অনেক নিয়োগকর্তা শ্রমিকের প্রকৃত চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতি করে ভুয়া চাহিদাপত্র জমা দেওয়ায় কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্লাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, নতুন কর্মীরা যেতে পারছে না। তারা চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে ফেলেছে। প্রশিক্ষণ নিয়েছে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে কিন্তু এখন তারা যেতে পারবে না। এতে তাদের পরিবার কিন্তু ঝুঁকিতে পড়লো এবং যারা যেতে পারলো না তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। কতজনের ভিসার মেয়াদ বাড়বে জানা যায়নি, আবার তাদের যে সবাই পরে যেতে পারবে সে নিশ্চয়তাও নাই। এই যুদ্ধের কারণে কিন্তু নিয়োগকর্তাদের যে চাহিদা তা বদলে যাবে।
তিনি বলেন, প্রথমত তাদের ওপর ইম্প্যাক্ট পড়বে। দ্বিতীয়ত যারা বিদেশে আছে ৬০-৭০ লাখ তাদের কিন্তু সবার সুনির্দিষ্ট কাজ নাই। আমাদের অনেক মানুষ আছে, যারা দিনে দিনে কাজ করে বা সপ্তাহে একটা কাজ পেলে করে। তাদের মাস শেষে বেতন নাই। মধ্যপ্রাচ্যে এরকম কিন্তু ১০-২০ লাখ মানুষ ভয়াবহভাবে ইমপ্যাক্ট করবে। তাদের কাজ থাকবে না। ফলশ্রুতিতে ব্যক্তি ব্যক্তি থেকে পরিবার রাষ্ট্র সবাই ইমপ্যাক্ট হবে।
জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব শামিম আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমাদের যে অভিবাসন হয় তার ৭০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক। সে ক্ষেত্রে যুদ্ধের কারণে বর্তমানে ক্রাইসিস যেটা হচ্ছে, এখানে চার ক্যাটাগরির লোক আটকে গেলো। একটা হলো, যারা ওখানে কর্মরত আছেন তাদের একটা সেফটি সিকিউরিটির প্রশ্ন আসছে সবচেয়ে আগে, তারপরে যারা ছুটিতে আসছেন তারা ফেরত যেতে পারছেন না। তাদের ভিসা দেওয়া শেষ হয়ে যাচ্ছে। এটা একটা অনিশ্চয়তা, তৃতীয়ত হলো যাদের ভিসা কমপ্লিট হয়ে গেছে ফ্লাইটের জন্য ওয়েট করছেন, তারা যেতে পারছেন না, তাদের ভিসার মেয়াদ চলে যাবে। চতুর্থত হলো যাদের অভিবাসন প্রক্রিয়াধীন যেগুলো আছে সেগুলো। পঞ্চমত হলো যেসব ডিমান্ড আন্ডার প্রসেস আছে। এখন সবই তো বন্ধ হয়ে গেছে। এখন এটা একটা বিশাল ইমপ্যাক্ট পড়ে যাবে। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে হয়তো অতটা হবে না।
তিনি বলেন, একটা আর্থিক ক্ষতি আছে এখানে। কারণ ফরেন এমপ্লয়মেন্ট অনেক এক্সপেন্ডিচার আছে। এখন যাদের হাতে কাজ আছে, তারা যদি কর্মী ঠিকমতো না পাঠাতে পারেন যেভাবে কর্মী সাফার করবে সেইসঙ্গে সেক্টরের এজেন্সিগুলোও সাফার করবে। দ্রুত যদি এর কোনও ব্যবস্থা না হয় বা এর নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে যত সময় যাবে তত এটার প্রভাব পড়বে। সেই ক্ষেত্রে এখন অন্য যে বাজারগুলো আছে সেগুলোর দিকে একটু মনোযোগী হওয়া দরকার।