Image description

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) মতো ক্যারিয়ার ছেড়ে গবেষণার মতো কঠিন ও দীর্ঘ পথ বেছে নেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সেই সাহসী সিদ্ধান্তই আজ অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে। অধ্যবসায়, সততা ও লক্ষ্যভেদী মনোভাবকে পুঁজি করে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অনন্য পথচলা, যেখানে ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও রেখে চলেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান।

সম্প্রতি ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোস্তাফিজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সাথে কথা বলেছেন ঈদ স্মৃতিসহ নানা বিষয় নিয়ে। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সিনিয়র রিপোর্টার মো. শিহাব উদ্দিন

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস:  ঈদ। এই শব্দটা প্রথমে কোন দৃশ্যটা সর্বপ্রথম চোখে ভেসে ওঠে?
অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান: ঈদ শব্দটা শুনলেই সবার আগে চোখে ভেসে ওঠে— ভোরবেলার সেই নির্মল দৃশ্য। নতুন পোশাক পরে মানুষজন দলে দলে ঈদগাহের দিকে যাচ্ছে, চারপাশে হাসি-খুশির আমেজ, বাতাসে আতরের মিষ্টি গন্ধ। নামাজ শেষে কোলাকুলি—“ঈদ মোবারক” বলার উষ্ণতা, ছোটদের উচ্ছ্বাস, বড়দের মমতা। নেই কোন বৈষম্য।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার শৈশবের ঈদ নিয়ে জানতে চাই। কেমন ছিল ওই সময়গুলো?
অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান: শৈশবের ঈদ মানেই ছিল নতুন জামার জন্য অপেক্ষা, চাঁদ রাতের উত্তেজনা, ভাই-বোন ও বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া, হৈচৈ, কখন সকাল হবে সেই অস্থিরতা। ভোরে তাড়াতাড়ি উঠে গোসল করে নতুন পোশাক পরে সবার সাথে ঈদগাহে যাওয়া। নামাজ শেষে সবার সাথে কোলাকুলি, আর তারপরই শুরু হতো সবচেয়ে প্রিয় অংশ ঈদি নেওয়া। ঘরে ফিরে সেমাই, পায়েস, নানান মজার খাবার আর দিনভর বন্ধুদের সাথে ঘোরাঘুরি, আনন্দ, খেলা। ছোট ছোট বিষয়েই যে আনন্দটা পাওয়া যেত, সেটাই ছিল ঈদের আসল সৌন্দর্য।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো এমন কোনো বিশেষ স্মৃতি কিনা; যেটা বেশি মনে পড়ে
অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান: পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো ঈদের এমন অনেক স্মৃতি থাকে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে ছোটবেলার সেই সরল আনন্দগুলো। ভোরে নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে সবাই একসাথে বসে সেমাই খাওয়া, মা-বাবার মুখে তৃপ্তির হাসি—এই দৃশ্যগুলো খুব গভীরভাবে মনে গেঁথে থাকে। তারপর বন্ধুদের সাথে বের হওয়া; কে কত ঈদি পেল, কে কী নতুন জামা পরেছে, এসব নিয়ে হাসি-ঠাট্টা, গল্প আর ঘুরে বেড়ানো। আরেকটা বিশেষ স্মৃতি হলো- আত্মীয়দের বাসায় ঘুরতে যাওয়া। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, আপ্যায়ন, সবার ভালোবাসা একটা আলাদা উষ্ণতা ছিল। আসলে এসব স্মৃতির সৌন্দর্যটা বড় কোনো ঘটনার মধ্যে নয়, বরং ছোট ছোট মুহূর্তে—একসাথে থাকা, হাসি, আর নিঃস্বার্থ আনন্দে।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আগের ঈদ আর বর্তমানের ঈদ, পার্থক্য কী খুঁজে পান?
অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান: আগের ঈদ আর বর্তমানের ঈদের মধ্যে পার্থক্যটা মূলত অনুভূতি, জীবনযাপন ও সামাজিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সাথে জড়িত। আগের দিনে ঈদের আনন্দ ছিল অনেক বেশি সরল আর আন্তরিক। নতুন জামা, সেমাই, আর পরিবারের সবার সাথে একসাথে সময় কাটানো; এই ছোট ছোট বিষয়েই আনন্দ পূর্ণ হয়ে উঠত। প্রযুক্তির প্রভাব কম থাকায় মানুষ সরাসরি একে অপরের বাসায় যেত, কোলাকুলি করত, সম্পর্কগুলো ছিল আরও ঘনিষ্ঠ।

অন্যদিকে, বর্তমানের ঈদ অনেকটাই আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেছে। এখন মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন শুভেচ্ছা, সব কিছুতেই একটা ভার্চুয়াল ছোঁয়া। মানুষ আগের মতো সময় নিয়ে ঘুরতে যায় কম, ব্যস্ততা বেড়েছে, আর অনেক ক্ষেত্রে ঈদের আনন্দটা কিছুটা আনুষ্ঠানিক বা বাহ্যিক হয়ে পড়েছে।

আরেকটা বড় পার্থক্য হলো, আগে পরিবারকেন্দ্রিকতা বেশি ছিল। যৌথ পরিবারে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি হতো। এখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বেড়েছে, অনেকেই কাজ বা পড়াশোনার কারণে দূরে থাকে, ফলে সেই একসাথে থাকার আনন্দটা কিছুটা কমে গেছে। তবে একটা বিষয় একই আছে, ঈদ মানেই আনন্দ, ভালোবাসা আর একে অপরের সাথে সম্পর্ক মজবুত করার সুযোগ। শুধু সময়ের সাথে সেই আনন্দ প্রকাশের ধরনটাই বদলে গেছে।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: ছোটবেলায় ঈদ সালামি পেতেন এখন নিশ্চয়ই দিতে হয়। কোনটি বেশি আনন্দের।
অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান: ছোটবেলায় ঈদ সালামি পাওয়ার আনন্দটা ছিল একদম আলাদা। নতুন নোট, কয় টাকা হলো সেটা গুনে দেখা, বন্ধুদের সাথে তুলনা করা, এসবেই একটা শিশুসুলভ উত্তেজনা কাজ করত। তখন পাওয়ার আনন্দটাই ছিল সবচেয়ে বড়।
কিন্তু এখন যখন সালামি দিতে হয়, আনন্দটা একটু ভিন্ন ধরনের। এখানে টাকার অঙ্ক নয়, বরং ছোটদের মুখের হাসি, তাদের খুশি দেখার মধ্যেই তৃপ্তি আসে। নিজের ছোটবেলার সেই অনুভূতিটা অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারা এটাই এক ধরনের গভীর আনন্দ। তাই বলা যায়, ছোটবেলায় সালামি পাওয়ার আনন্দটা ছিল সরল আর ব্যক্তিগত, আর এখন সালামি দেওয়ার আনন্দটা বেশি পরিপক্ব ও আত্মতৃপ্তির। অনেকের কাছে, এই দেওয়ার আনন্দটাই শেষ পর্যন্ত বেশি গভীর হয়ে ওঠে।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: ঈদ উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বার্তা দিতে চান?
অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান: ঈদ উপলক্ষে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তাটি  হলো—পবিত্র ঈদুল ফিতরের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানাই তোমাদের সবাইকে।
এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ আমাদের সামনে নিয়ে আসে সংযম, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির মহৎ শিক্ষা। এই শিক্ষা শুধু ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষাজীবন ও সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তোমাদের দায়িত্ব শুধু জ্ঞান অর্জন নয়, বরং নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ একজন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা। ঈদ আমাদেরকে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। তাই এই আনন্দের দিনে সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে তোলাই হবে প্রকৃত ঈদের চেতনা ধারণ করা। আমি আশা করি, তোমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করবে এবং অর্জিত জ্ঞানকে মানবতার সেবায় নিয়োজিত করবে। সবার ঈদ হোক আনন্দময়, নিরাপদ ও কল্যাণকর।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানতে চাই। শিক্ষার্থী থেকে উপাচার্য—হওয়ার গল্প শুনতে চাই।
অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান: শিক্ষার্থী থেকে উপাচার্য হওয়ার পথটা সরল নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি সঠিক পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়া এবং অনেক চ্যালেঞ্জ পেরোতে হয়েছে। ছোটবেলার আগ্রহ যদি সঠিক পথে পরিচালিত হয়, তবে একদিন সেই আগ্রহ শুধু নিজের জন্য নয়, বহু মানুষের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে। আমার আব্বা একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। দাদাকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আব্বার কাছে শুনেছি দাদা বৃটিশ আমলে এনট্রেন্স পাশ করার পর সঠিক গাইডেন্সের অভাবে আর পড়ালেখা না করে এমন কি চাকরির অফার থাকা সত্বেও নিজে একটি মক্তব দিয়ে শিক্ষকতা করতেন। হয়তো দাদা ও আব্বার নোবেল পেশাটা আমার জীবনের পাথেয় হয়েছে। আমার জীবনের লক্ষ্য আমি আমার আব্বার আদর্শ থেকে বেছে নিয়েছি বিধায় আমি বিসিএস-এ লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহন না করে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে একজন গবেষক হিসেবে যোগদান করি। লক্ষ্য ছিল পিএইচডি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া। জাপান থেকে পিএইচডি করে এসে শিক্ষক হলাম, বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী এবং ২০১৯ থেকে ২০২৪ এই ছয় বৎসর গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি) ও দেশের সেরা পাঁচজন বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্থান করে নিয়ে আল্লাপাকের অশেষ রহমতে ভাইস-চ্যান্সেলরও হলাম। অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য মূলত প্রয়োজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব, গুণাবলী এবং ধৈর্য ও পাশাপাশি নিরন্তর অধ্যবসায়, সততা, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ এবং মানুষের সেবার মনোভাব সর্বোপরী জীবনের একট লক্ষ্য মাত্রা থাকলেই একজন শিক্ষার্থী শুধু উপাচার্য নয় তার অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হবে যদি আল্লাহপাক সহায় হন।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী জটিল পরিস্থিতিতে গাকৃবির দায়িত্ব পেয়েছেন। উত্তাল পরিস্থিতি কীভাবে সামলেছেন?
অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান: জুলাই’২৪ গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ছাত্র আন্দোলন ও প্রশাসনিক চাপ ছিল তীব্র। তখন গাকৃবিতে উপাচার্য হিসাবে দায়িত্ব নেওয়া আমার জন্য ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শঙ্কিত।
প্রথমত, জুলাই গণঅভ্যুত্থান তথা বিগত ১৫/১৬ বছরের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমি একজন পেশাজীবী হিসেব সক্রীয়ভাবে অংশগ্রহন করেছি বিধায়  আমি পরিস্থিতি যথাযত মূল্যায়ন করতে পেরেছিলাম। তাই যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আমি চাইছিলাম শান্তি ও সংলাপ বজায় থাকুক। তাই প্রথম করণীয় হিসেবে বিবেচনায় আনা হয়েছিল খোলামেলা আলোচনা। শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পৃথক ও যৌথ সভা।তাদের উদ্বেগ, অভিযোগ ও প্রস্তাব শোনা।  সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝি কমানো।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেছি, শিক্ষার্থীদের সাথে সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা ও কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ক্লাস ও পরীক্ষা পুনরায় চালু করেছি।

তৃতীয়ত, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা বজায় রাখা। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো সর্বদা শিক্ষার্থীদের ও শিক্ষকগনের কাছে প্রকাশ্যভাবে জানানো হয়েছে, যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা বিভ্রান্তি না হয়।

চতুর্থত, মানবিক দিক—উত্তাল সময়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শিক্ষাগত সহায়তার দিকে মনোযোগ। তাদের কাছে নিশ্চিত করা হয়েছিল যে, কেউ অসহায় বোধ করবে না; শিক্ষা বিষয়ক ক্ষতি মিমাংসা করা হবে এবং শিক্ষার্থীদের  ন্যায্য দাবীগুলো মেনে নিয়ে সেই গুলো দ্রুততার সাথে ক্রমান্নয়ে সমাধান করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত, সংলাপ, ধৈর্য, স্বচ্ছতা এবং মানবিক মনোভাবের মাধ্যমে উত্তাল পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আবার শিক্ষাগত এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে স্বাভাবিকভাবে ফিরে এসেছে।

যে কোনো জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সংলাপ, ধৈর্য, নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা। কঠিন সময়েই একজন উপাচার্যের সত্যিকারের নেতৃত্বের পরীক্ষা হয়। আলহাম্দুলিল্লাহ সবার সহযোগিতায় করতে পেরিছি বিধায় অতি অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের শ্রেনী কক্ষে নিতে পেরেছি বিধায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য সশনজটমূক্ত শিক্ষা কার্যক্রম সফলতার চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। 

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনি উপাচার্য হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে গাকৃবি সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে একাধিকবার। এই সাফল্য কীভাবে অর্জন করেছেন? সেই গল্প শুনতে চাই। 
অধ্যাপক ড. জিএকেএম মোস্তাফিজুর রহমান: গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়টি মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর ‘সবুজ বিপ্লব’র স্বপ্নকে বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দক্ষ কৃষিবিদ গড়ার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে Center of Excellence in Agriculture হিসেবে Bangladesh College of Agricultural Sciences প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে সম্পূর্ন রাজনৈতিকমূক্ত পরিবেশে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা সবাই নিরন্তর গবেষণা ও শিক্ষা কাজে একটি টিমওয়ার্কের  মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরপত্তায় ভূমিকা রাখবে। তাঁর দূরদর্শী উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় যা পরবর্তীতে JICA, USAID এবং বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয় Institute of Postgraduate Studies in Agriculture (IPSA), যা কৃষি ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। IPSA-কে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৪ সালে জাতীয় সংসদে IPSA আইন অনুমোদন করেন এবং ১৯৯৫ সালে প্রথম সমাবর্তনে তিনি আচার্য হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।  পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয় এবং ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয় “গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়”। 

জুলাই’২৪ গণঅভ্যুত্থানের পর আমি উপাচার্য হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিশ্বিবিদ্যালয়ের সর্বক্ষেত্রে ছিল দলীয়করন। যা এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের সাথে ছিল সাংগর্ষিক। কাজেই আমাদের মহান নেতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর উদ্দেশ্যকে পূনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্যাম্পাসের ভিতরে সকল প্রকার রাজনৈতিক কর্মকান্ড প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া। প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ থাকা নাগরিক অধিকার সেটা ক্যাম্পাসে নয়, ক্যাম্পাসের বাইরে। 

তারপরের পদক্ষেপগুলো ছিল প্রশাসনিক কার্যক্রমকে দ্রুত, দক্ষ ও স্বচ্ছ করা। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও উদ্ভাবনী মনোভাব উন্নয়ননের নিয়মিত মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা সভার মাধ্যমে সমস্যা নির্ধারণ ও সমাধান। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করতে উৎসাহ ও সমর্থন দেওয়া। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থার সঙ্গে একাডেমিক ও গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানোর দ্রুত উদ্যোগ গ্রহন। প্রথম বারের মত আন্তর্জাতিক সেমিনার ২০২৫ আয়োজন। শিক্ষাক্রম ও গবেষণা কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী মানসম্মত করার বিভিন্ন নানামুখী উদ্যোগের মাধ্যমে এবং নতূন প্রশাসনের দক্ষ নেতৃত্বে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলের একনিষ্ঠ ও নিরলস  টিমওয়ার্কের  মাধ্যমে একডেমী, গবেষণা এবং Outreach প্রোগ্রামে আমূল পরিবর্তনের দ্বারা এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই দূর্বার গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিধায় ২০২৪-২০২৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে  Times Higher Education(THE), Word University Ranking for Innovation(WURI) এবং QS র‍্যাঙ্কিং এ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে দেশ সেরা বিশেষ করে Life Science ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশের সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে সেরা এক নাম্বার বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে নির্বাচিত হয়েছে। শুধূ তাই নয়, ২০২৬ এ গাজীপূর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অনেক ধাপ এগিয়ে ৪০১-৪৭৫ এর মধ্যে চলে এসেছে, যা ২০২৪ সালের পূর্বে ৮০১-১০০০ এর মধ্যে ছিল। আশাকরি সকলকে নিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্ব র‍্যাংকিং ১০০-২০০ এর মধ্যে নিয়ে আশা যাবে ইনশাল্লাহ। 

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার গবেষণা, সাইটেশন, পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের গল্প শুনতে চাই।
অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান: জীবনের লক্ষ্য ছিল একজন সফল গবেষক কাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে কৃষিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার পর, জাপানের স্বনামধন্য চিবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “মাটি, পানি ও পরিবেশ দূষণ ব্যবস্থাপনা ও প্রতিকার” এর উপর পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ের উপর পোস্ট-ডক্টরাল গবেষনা করা। সেই ১৯৯০ সাল থেকে গবেষণায় দীর্ঘ ৩৫ বৎসর পথ চলায় মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, মাটি-পানি-পরিবেশ দূষণ মূল্যায়ন ও ব্যাবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যাবস্থাপনা করে সমৃদ্ধ জৈব পদার্থ তৈরী, জলবায়ূ পরিবর্তনে কৃষি ও পরিবেশে প্রভাব এবং তার প্রতিকার নিয়ে গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। জাপান থেকে পিএইচডি ও  পোস্ট-ডক্টরাল করে এসে শিক্ষক হলাম, বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী এবং ২০১৯ থেকে ২০২৪ এই ছয় বৎসর যাবৎ গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি) ও দেশের সেরা পাঁচজন বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্থান করে নিয়ে আল্লাপাকের অশেষ রহমতে ভাইস-চ্যান্সেলরও হলাম। 

ভিজিটিং প্রফেসর, এক্সপার্ট গেস্ট রিসার্চার এবং আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞ আলোচক ও পেপার উপস্থাপক হিসেবে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, ভারত, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, সুইডেন, দক্ষিন আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, প্রভৃতি দেশে এবং কোন দেশে একাধিকবার সফর ।

জার্নাল প্রকাশিত পেপার সংখ্যা ২০০ উপরে, সেমিনার পেপার-৩০ (বিদেশী ১২), সুপারভাইজ্ড এমএস থিসিস-৪৫ টি, সুপারভাইজ্ড পিএইচডি ডিজার্টেশান থিসিস-৩০ টি, বই/বইয়ের অধ্যায়-৬, জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ-৩। গুগল স্কলার সাইটেশন স্কোর-২৩৬৮ (h-index: 26, i10-index: 49), আলহামদুলিল্লাহ বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী এবং ২০১৯ থেকে ২০২৪ এই ছয় বৎসর যাবৎ গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি) ও দেশের সেরা পাঁচজন কৃষি বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্থান  করে নেওয়া একজন হতে পেরে এবং দেশের জন্য কিছু করতে পেরে নিজের জন্মটাকে কিছুটা হলেও স্বার্থক মনে করছি। 

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: এত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান: দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকেও ধন্যবাদ।