রাস্তায় যাতায়াতের সময় প্রায়শই পথের ধারে পোড়া সিগারেটের টুকরো পড়ে থাকতে দেখা যায়। ধূমপানের পরে ফেলে দেওয়া সিগারেটের ফিল্টার কতটা ক্ষতি করে পরিবেশের, কখনও ভেবে দেখেছেন? এরা সহজে মিশতে চায় না মাটিতে। পচন হয় ধীর গতিতে। এমনকি, ১০ বছর পরেও এরা ‘বিষ’ ছড়ায় পরিবেশে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মিলেছে এমন তথ্য।
পোড়া সিগারেটের ফিল্টার যে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, তা আগেই প্রমাণিত। তবে কতটা? বিশেষ করে এতটা দীর্ঘ সময় পরে তা কী প্রভাব ফেলে পরিবেশে, তা নিয়ে এত দিন খুব বেশি কিছু জানা ছিল না। কারণ এত দিন এ বিষয়ে যে গবেষণাগুলি হয়েছে, তার বেশির ভাগই স্বল্পমেয়াদি।
সদ্য পড়ে থাকা সিগারেটের ফিল্টার (এক দিন বা এক মাস সময় ধরে পড়ে থাকা ফিল্টার) নিয়েই গবেষণাগুলি হয়েছিল। তবে এ গবেষণাটি ১০ বছর ধরে পর্যবেক্ষণের ফসল। দীর্ঘ এক দশক ধরে পড়ে থাকা সিগারেটের ফিল্টারগুলির কতটা ক্ষয় হয়, কী কী পরিবর্তন আসে, সেই সব ধরা পড়েছে এই গবেষণায়।
সিগারেটের ফিল্টার মূলত তৈরি হয় সেলুলোজ় অ্যাসিসেট দিয়ে। এটি হল সেলুলোজ়ের একটি প্লাস্টিক পলিমার। সেলুলোজ়ের সঙ্গে অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইডের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তৈরি হয় এটি, যা বহু বছর ধরে পড়ে থাকার পরেও পুরোপুরি ক্ষয়ে যায় না। মাটিতে পড়ে থাকলে বিভিন্ন পচনশীল পদার্থের মতো এগুলিরও ভৌত, রাসায়নিক এবং জৈবিক পরিবর্তন হয়।
১০ বছরেও তা পুরোপুরি মাটিতে মেশে না। এর মধ্যে পরিবর্তনগুলো হয় খুব ধীর গতিতে। শেষে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো অবশিষ্টাংশ হয়ে মাটিতে পড়ে থাকে। অন্তত ১০ বছর ধরে চলা পর্যবেক্ষণে এমনটাই উঠে এসেছে।
সম্প্রতি পরিবেশ দূষণ বিষয়ক জার্নাল ‘এনভার্নমেন্টাল পলিউশন’-এ এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। সিগারেটের ফিল্টার পরিবেশে কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে অন্যতম বিশদ চিত্র তুলে ধরে এই গবেষণাটি। একই সঙ্গে দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের উপরেও আলোকপাত করে।
বিভিন্ন এলাকায়, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে পড়ে থাকা সিগারেটের ফিল্টারের উপরে এই গবেষণা চলে। হাজার হাজার ফিল্টারকে নমুনা হিসাবে ব্যবহার করা হয়। শহুরে এলাকায়, বেলে মাটিতে বা জৈবিক পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটি (যেখানে গাছপালা প্রচুর)— তিন ধরনের জায়গার নমুনাতেই এই গবেষণা চলে।
প্রতিটি এলাকায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিল্টারে কী কী পরিবর্তন আসছে, তা পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। এক দশক ধরে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সিগারেটের ফিল্টারের ভর কমেছে। অর্থাৎ, কিছু অংশে পচন হয়েছে। কিছু পরিবর্তনও এসেছে। তবে পরিবর্তনের গতি এক এক ক্ষেত্রে এক এক রকম।
গবেষণায় দেখা গেছে, পড়ে থাকা ফিল্টারগুলো প্রাথমিক পর্যায়ের পচন দ্রুতই ঘটে। প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাইরের স্তরগুলি ভাঙতে শুরু করে। মাটিতে মিশে যেতে শুরু করে ওই অংশগুলি। তবে প্রাথমিক পর্যায় কেটে যাওয়ার পরে পচনের গতি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে খুব ধীর গতিতে ক্ষয় হয় এটিতে।
এর কারণ ফিল্টারের নিজস্ব গঠন। ধূমপানের সময়ে ফিল্টারের পরিস্রাবণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য সেলুলোজ় অ্যাসিসেট তন্তুকে রাসায়নিকভাবে পরিবর্তন করা হয়। এই বিশেষ গড়নের জন্যই পচন ধীর গতিতে হয়। যে পরিবেশে মাটিতে জৈবিক পদার্থের পরিমাণ কম, সেখানে ফিল্টারের পচন তুলনামূলক ধীর গতিতে হয়।
যেমন শহুরে এলাকায় ১০ বছর পরও ফিল্টারের তন্তুগুলি অনেক ক্ষেত্রেই প্রায় অক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকে। সেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে পচনের পরে গোটা প্রক্রিয়াটি থমকে যায়। তবে অনুকূল পরিবেশে, যেখানে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি, সেখানে ফিল্টারে অণুজীব বাসা বাঁধে। ধীরে ধীরে ফিল্টারের তন্তুর গঠন ভাঙতে শুরু করে সেই অনুজীব। তবে গতি খুবই ধীরে।
পরীক্ষা করা নমুনাগুলির মধ্যে শহুরে এলাকায় ১০ বছর পরে প্রায় ৫২ শতাংশ পচন হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক তখনও টিকে ছিল পরিবেশে। জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ মাটির ক্ষেত্রে পচনের হার তুলনায় বেশি। ১০ বছর পরে ওই এলাকাগুলির নমুনায় প্রায় ৮৪ শতাংশ পচন দেখা গিয়েছে। তবে কিছু অংশ তখনও রয়ে গিয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে গবেষণায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনুকূল পরিবেশে মাটিতে পড়ে থাকা সেলুলোজ় অ্যাসিটেট তন্তু ক্রমে ভাঙতে শুরু করে। এবং ধীরে ধীরে আশপাশের মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নীচে রাখলে দেখা যায়, ১০ বছর ধরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় হলেও এটি পুরোপুরি মিশে যায় না। অণুজীব বাসা বাঁধার পরেও ফিল্টারের মূল উপাদানের কিছু টুকরো রয়েই যায়।
গবেষকদের দাবি, এই ফিল্টারগুলি মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরিতে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় এও দেখা গেছে, ১০ বছর পরও এই ফিল্টারের মধ্যে বিষাক্ত পদার্থ রয়ে যায়। গবেষকদের দাবি, সদ্য ফেলে দেওয়া সিগারেটের ফিল্টার জলের সংস্পর্শে এলে তা থেকে নিকোটিন, অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনের মতো বিভিন্ন বিষাক্ত যৌগ নির্গত হয়। এগুলো জলের বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কয়েক বছর ধরে পড়ে থাকার পরেও সিগারেটের ফিল্টারের ‘বিষ’ হারিয়ে যায় না। সদ্য পোড়া সিগারেটের ফিল্টার থেকে সবচেয়ে বেশি বিষাক্ত পদার্থ ছড়ায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ কমতে থাকে। তবে তা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায় না। খবর: আনন্দবাজার।