Image description

রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের মতো পাকিস্তানকেও হুমকি মনে করছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা তুলসি গ্যাবার্ড।

বুধবার সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির সামনে ২০২৬ সালের বার্ষিক হুমকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স তুলসি গ্যাবার্ড বলেন, এই পাঁচটি দেশ নতুন, উন্নত বা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র বহনব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন করছে, যা পারমাণবিক ও প্রচলিত অস্ত্র বহনে সক্ষম এবং আমাদের ভূখণ্ডকে তাদের নাগালের মধ্যে আনতে পারে।

পাকিস্তান প্রসঙ্গে গ্যাবার্ড বলেন, ‘পাকিস্তানের দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্ভাব্যভাবে এমন আইসিবিএম (ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল) অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম।’

লিখিত প্রতিবেদনে পাকিস্তানকে একাধিক হুমকির ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়, পাকিস্তান ‘ক্রমেই উন্নততর ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা দিতে পারে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এমন আইসিবিএম তৈরি সম্ভব।’

 

গণবিধ্বংসী অস্ত্র প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান, চীন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়া ‘সম্ভবত এমন ডেলিভারি সিস্টেম উন্নয়ন অব্যাহত রাখবে, যা নির্ভুলতা বাড়াবে, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং নতুন ধরনের ডব্লিউএমডি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে।’

প্রতিবেদনটি দক্ষিণ এশিয়াকে ‘দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের অঞ্চল’ হিসেবে উল্লেখ করে এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ককে পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করে। এতে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পাহেলগাম হামলার উদাহরণ তুলে ধরা হয় এবং বলা হয়, সহিংসতা কীভাবে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ সাম্প্রতিক পারমাণবিক উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রেখেছে’ এবং ‘কোনো পক্ষই খোলা সংঘাতে ফিরতে চায় না।’

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্ভাব্য হুমকিস্বরূপ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি, যা ২০৩৫ সালের মধ্যে অন্তত ১৬ হাজারে পৌঁছাতে পারে।

এ বিষয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

পাকিস্তান কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে পারবে?
গ্যাবার্ডের মন্তব্য মূলত ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে।

তবে বিশেষজ্ঞরা এই মূল্যায়নের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

 

পাকিস্তানের সবচেয়ে দীর্ঘপাল্লার কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র শাহিন-থ্রি। এর সক্ষমতা প্রায় ২৭৫০ কিলোমিটার, যা পুরো ভারতকে আচ্ছাদিত করতে পারে। সাধারণভাবে আইসিবিএম বলতে ৫৫০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বোঝায়, যা পাকিস্তানের বর্তমানে নেই।

এমনকি স্বল্পপাল্লার আইসিবিএম থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো পাকিস্তানের পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ দুই দেশের দূরত্ব ১১২০০ কিলোমিটারেরও বেশি।

বর্তমানে এই সক্ষমতা রয়েছে কেবল রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন ও যুক্তরাজ্যের। ভারত ও উত্তর কোরিয়া এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, আর ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও এমন সক্ষমতার ধারণা করা হয়।

 

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন কর্মকর্তারা ধারণা দেন, পাকিস্তানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জনে ‘কয়েক বছর থেকে এক দশক’ সময় লাগতে পারে। গ্যাবার্ডের বক্তব্যেও এই মূল্যায়নের বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না।

পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া
পাকিস্তান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা তুঘরাল ইয়ামিন বলেন, ‘এ ধরনের মন্তব্য আগে থেকেও এসেছে। পাকিস্তান সবসময় বলেছে, তাদের প্রতিরোধ নীতি ভারতের জন্য, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত জলিল আব্বাস জিলানি বলেন, ‘গ্যাবার্ডের দাবি বাস্তবতার ভিত্তিতে নয়। পাকিস্তানের পারমাণবিক নীতি পুরোপুরি ভারতকেন্দ্রিক।’

সাবেক কূটনীতিক আবদুল বাসিতও এই মন্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে সমালোচনা করেছেন।

বিতর্কের মূল প্রশ্ন: উদ্দেশ্য কী?
কিছু মার্কিন বিশ্লেষক মনে করেন, পাকিস্তান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে এই সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।

তবে পাকিস্তানি বিশেষজ্ঞরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। গবেষক রাবিয়া আখতার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নে প্রায়ই বাস্তব বিশ্লেষণের বদলে সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাকিস্তানের প্রতিরোধ কৌশল পুরোপুরি ভারতকেন্দ্রিক।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই।’

জটিল কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই মূল্যায়ন এসেছে এমন সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্ক নতুন করে উষ্ণ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

২০২৫ সালে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক পুনঃসংলাপ শুরু হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, তার প্রশাসন যুদ্ধবিরতিতে ভূমিকা রেখেছে।

জুনে ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানান, যা ছিল বিরল ঘটনা।

মধ্যপ্রাচ্যেও পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে।

সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক এখনো চলমান, যেখানে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও বিশেষজ্ঞ মতামতের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে।

সূত্র: আল জাজিরা