আওয়ামী আমলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আইয়ুব আলী শত শত টাকা লুট করলেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শাস্তির বদলে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী। অন্তর্বর্তী সরকারের নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.)এম সাখাওয়াত হোসেন তাকে এই সুযোগ করে দেন। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে উপদেষ্টা সাখাওয়াত অত্যন্ত তড়িঘড়ি তাকে পদোন্নতির এ পুরস্কার দেন। এই পদোন্নতিতে বিপুল অর্থের লেনদেনের কথা এখন সংস্থাটিতে আলোচনায় রয়েছে।
প্রকৌশলী আইয়ুবের দুর্নীতি একাংশ
আইয়ুব আলী সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এপিএস (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের এমপি) সাইফুজ্জামান শিখরের আপন ভায়রা তিনি- এই পরিচয়েই তিনি মহাদাপটের সঙ্গে কাটিয়েছেন আওয়ামী লীগ আমলের প্রায় পুরোটা সময়। যদিও শিখর নয়, তার বড় ভাই সাচ্চু এই প্রকৌশলী আইয়ুবের আপন ভায়রা, কিন্তু আইয়ুব বরাবর শিখরকেই ভায়রা হিসেবে পরিচয় দিতেন। বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তাকে শিখরের ভায়রা হিসেবেই জানতেন। এ কারণে বিআইডব্লিউটিএ’র শীর্ষ কর্মকর্তারা, এমনকি মন্ত্রণালয়ও প্রকৌশলী আইয়ুব আলীর দাপটে তটস্থ থাকতেন আওয়ামী লীগ আমলে। এই প্রভাব খাটিয়েই প্রকৌশলী আইয়ুব বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজার ক্রয় এবং ড্রেজিংয়ের একের পর এক আকর্ষণীয় প্রকল্প বাগিয়ে নিয়েছিলেন। ড্রেজার ক্রয় প্রকল্পে জাল-জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ নিয়েছেন। ড্রেজিং প্রকল্পেও ব্যাপকহারে লুটপাট চালিয়েছেন। টেন্ডার কার্যক্রমে কারসাজি করে দুর্নীতিবাজ মাফিয়া ঠিকাদার নিয়োগ করেছেন। প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিংয়ের মূল্য নির্ধারণ করেছেন অস্বাভাবিক হারে, যার নজির অতীতে নেই। ড্রেজিংয়ের কাজ না করা সত্ত্বেও বিল পরিশোধ করেছেন। এছাড়া ড্রেজিংয়ের সরকারি মাটি বিক্রি করে সেই অর্থও আত্মসাত করেছেন। দেশে গড়েছেন বিপুল সম্পদ, বিদেশেও পাচার করেছেন অঢেল অর্থ।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, প্রকৌশলী আইয়ুব আলীর বিদেশে অর্থপাচারের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতা ও ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম। সাইফুল ইসলামের বঙ্গ ড্রেজিং নামে প্রতিষ্ঠানটিকে টেন্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধ প্রক্রিয়ায় ড্রেজিংয়ের কাজ পাইয়ে দেন প্রকৌশলী আইয়ুব। ঢাকা-চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নৌপথ ও বরিশাল এলাকায় নদী খননের কাজ দেয়া হয়েছে বঙ্গ ড্রেজিং কোম্পানিকে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটারের রেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৩২.০০ টাকা করে। যদিও বিআইডব্লিউটিএ’তে চলমান বিভিন্ন ড্রেজিং প্রকল্পসহ প্রায় সকল ধরনের সংরক্ষণ ড্রেজিং কাজের জন্য ব্যয় হয়ে থাকে প্রতি ঘনমিটার ১৪৫.০০-১৬০.০০ টাকা করে। এমন আরো প্রকল্পে বেশি দর দেখিয়ে চুক্তি করেন আইয়ুব। পতিত সরকারের আমলে এই কাজগুলোতে একক আধিপত্য বিস্তার করেন প্রকৌশলী আইয়ুব আলী। বঙ্গ ড্রেজিং ছাড়াও আরেকটি মাফিয়া ঠিকাদার কর্ণফুলী ড্রেজিংয়ের সঙ্গে প্রকৌশলী আইয়ুবের রয়েছে দহরম-মহরম সম্পর্ক। বঙ্গ এবং কর্ণফুলী- দুটি প্রতিষ্ঠানকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৪০ লাখ ঘনমিটার মাটির বিল বাবদ ৭০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। সে হিসেবে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ৪৭৬ কোটি টাকা। এই অতিরিক্ত ৪৭৬ কোটি টাকা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন আইয়ুব আলী। এছাড়া প্রকল্পের দরপত্রে কার্যাদেশ দেয়ার সময়ই দুটি লটে কাজের জন্য বড় অংকের ঘুষ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। গোপালগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা ও ঠিকাদার সাইফুলের অস্ট্রেলিয়াতে ব্যবসা আছে। সেখানে সাইফুলের ছেলে থাকে। সাইফুলের ছেলের মাধ্যমে এসব কাজের কমিশনের টাকা বিদেশে পাচার করে থাকেন প্রকৌশলী আইয়ুব। অস্ট্রেলিয়ায় একই স্থানে আইয়ুবের ছেলেদেরও স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আলিশান বাড়িও নির্মাণ করে দিয়েছেন সেখানে প্রকৌশলী আইয়ুব।
জানা যায়, প্রকৌশলী আইয়ুব আলী একই কাজের কথা বলে বেশ কয়েকজন ঠিকাদারের কাছ থেকে অগ্রিম ঘুষ নিয়েছিলেন। সেইসব ঠিকাদাররা কাজ না পেয়ে একাধিক বার আইয়ুব আলীকে মারধরও করেছেন। তারপরও লজ্জা বা বিবেকবোধ জাগ্রত হয়নি তার। একই অপকর্ম তিনি এরপরেও করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকৌশলী আইয়ুব আলী কারসাজি করে শ্মশানঘাট টার্মিনাল নির্মাণ বাবদ ৬০ কোটি টাকার কাজ দিয়েছেন গোপালগঞ্জের আওয়ামী নেতা ও ঠিকাদার বঙ্গ ড্রেজিং এর মালিক সাইফুল ইসলামকে। এক্ষেত্রে প্রতিটি পল্টুনের দাম ধরা হয়েছে আড়াই কোটি টাকা করে, যার আসল মুল্য হচ্ছে ৬০/৭০ লাখ টাকা। অথচ এই টার্মিনালটি আগে থেকেই ব্যবহৃত হচ্ছিল না। যেখানে সদরঘাটের মতো টার্মিনাল ফাঁকা পড়ে আছে, সেই পরিস্থিতিতে শ্মশানঘাট টার্মিনালে অতিরিক্ত এই টাকা খরচ করাটা সরকারি অর্থের অপব্যয় ছাড়া কিছুই নয়। আওয়ামী লীগ নেতা ও ঠিকাদার সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি অর্থ আত্মাসাতের জন্যই মূলতঃ এ কাজগুলো হাতে নেয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আওয়ামী দুঃশাসনের আমলে নিয়োগ, বদলী, টেন্ডার বাণিজ্য, ড্রেজার ও যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় আইয়ুব গডফাদারের ভুমিকায় ছিলেন। রাজস্ব বাজেটের আওতায় সকল ধরনের জাহাজ মেরামত কাজে করেছেন পুকুর চুরি। বিল প্রদানের ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও শিখরের ক্ষমতায় সবকিছুতেই বেপরোয়া ছিলেন। প্রকৌশলী আইয়ুব আলী আওয়ামী লীগ আমলে বরাবরই কাজে-অকাজে ব্যবহার করতেন শেখ হাসিনার সাবেক এপিএস সাইফুজ্জামান শিখরের নাম। সেই সুবাদে তিনি মন্ত্রী শাজাহান খান এবং পরের নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। শিখরের রেফারেন্সেই দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত আইয়ুব আলীকে কাছে টেনে নেন মন্ত্রীরা। শিখরের নির্দেশনা অনুযায়ীই টেন্ডারের কাজ ভাগবাটোয়ারা করতেন তিনি। বিআইডব্লিউটিএ’তে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করে আওয়ামী লীগের দুর্নীতির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি পদে বিআইডব্লিউটিএ শাখার দায়িত্বে থাকা আইয়ুব আলী সরকার পতন হলেও থেকে যান বহাল- তবিয়তে। ৫ আগস্ট, ২০২৪-এর পরে তিনি কয়েকদিন গা-ঢাকা দিয়েছিলেন। পরে বিভিন্ন মহলে অর্থ লেনদেন করে আবার কাজে যোগ দেন। এক পর্যায়ে প্রকৌশলী আইয়ুবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয় নৌ পরিবহন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। উপদেষ্টা সাখাওয়াত কোটি কোটি টাকা পান প্রকৌশলী আইয়ুবের মাধ্যমে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে সাখাওয়াত হোসেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে আইয়ুবকে বিআইডব্লিউটিএ’র প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
প্রকৌশলী আইয়ুব ও তার পরিবারের যত সম্পদ
প্রকৌশলী আইয়ুব আলীর বিপুল সম্পদের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এ ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগও জমা পড়েছে। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের নামে রয়েছে বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, জমি, খামার, বায়োগ্যাস প্লান্ট ও মাছের ঘের। দুর্নীতি দমন কমিশনে দেয়া এক অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তিনি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিপুল সম্পদ সংগ্রহ করেন। জমি ও বাড়ি কেনা হয়েছে স্ত্রী ফারজানা নাহিদ লিজা, ছেলে নাভিদ ফারহান ঐশিক, মেয়ে পূর্ণতা ফারজানা, ভাই ওলিয়ার রহমান মোল্লা, মোশারফ হোসেন মোল্লা, ইউনুস মোল্লা ও একমাত্র বোন হালিমা বেগমের নামে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ফারজানা নাহিদের নামে তিন কাঠার প্লটে ৭ তলা ভবনের নির্মাণকাজ এখনো চলছে। বারিধারা ডিওএইচএস, পশ্চিম ধানমণ্ডি, জিগাতলা ও ধানমণ্ডি-৫ নম্বর রোডে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। হাজারীবাগ ও মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটেও ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি। আশুলিয়া, পূর্বাচল ও আফতাবনগরে একাধিক প্লট রয়েছে।
সাভারের আকরানে ১১ শতাংশ জমির ওপর গরুর খামার এবং আশুগঞ্জের চরচারতলায় বড় মুরগির খামার, বায়োগ্যাস প্লান্ট ও মাছের ঘের গড়ে তুলেন প্রকৌশলী আইয়ুব আলী। শুধু চারতলায় মুরগির খামার ও বায়োগ্যাস প্রকল্পেই প্রায় ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে
আইয়ুব আলী ২০২১ সালে লন্ডনে এবং ২০২৩ সালে নিউ ইয়র্কে বাড়ি কিনেছেন। দুদকে দেয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকৌশলী আইয়ুব আলী ছেলেদের নামে অস্ট্রেলিয়াতেও বিপুল সম্পদ কিনেছেন এবং ব্যাংক একাউন্টে টাকা স্থানান্তর করেছেন।
বর্তমানে চলমান ড্রেজিং প্রকল্পগুলোতে প্রতি ঘনমিটারে ব্যয় বাড়িয়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বিপুল অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। শুধু দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বিলে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া গত ১৫ বছরে ড্রেজার মেরামত, ক্রয় ও অন্যান্য প্রকল্পেও আইয়ুব আলী কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তিনি নিজেকে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে আওয়ামী আমলে বিআইডব্লিউটিএ’র বিভিন্ন প্রকল্পে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করেছেন। আইয়ুব আলীর দুই ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করছেন, মেয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। পরিবারসহ তিনি নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করেন। ব্যবহার করেন একাধিক গাড়ি। আইয়ুব আলীর দাপট নতুন সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার থেকে শুরু করে নদী-তীরবর্তী সাধারণ মানুষও চায়, তার দুর্নীতির তদন্ত হোক, নামে- বেনামে গড়া তোলা সম্পদের হিসাব নেওয়া হোক এবং পাচার করা অর্থ দেশে ফিরুক।
শীর্ষনিউজ