Image description

গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি কমাতে স্থলভাগ ও সাগরের ব্লকগুলোতে দ্রুত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে চায় সরকার। মোট ৪৭টি ব্লকে দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে।

সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে বলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগসংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সাগরে ও স্থলভাগে অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের অগ্রাধিকার ১৮০ দিনের মধ্যে দরপত্রের এ বিষয়ও থাকছে।’

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সংশোধিত উৎপাদন-বণ্টন কাঠামোর (পিএসসি) আওতায় দেশের স্থলভাগে ২১টি ব্লক এবং অফশোরে (সাগরে) ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (আইওসি) অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহবান করা হবে। এ উদ্দেশ্যে পেট্রোবাংলা তাদের প্রস্তুতি এগিয়ে নিয়েছে। সরকারের কাছ থেকে অনুমতি পেলে সাগরে ও স্থলভাগে দ্রুতই আন্তর্জাতিক দরপত্রে যেতে চায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থলভাগে ও সাগরে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানে পেট্রোবাংলা প্রস্তুত রয়েছে। সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনায়ও গ্যাস অনুসন্ধানে অফশোর-অনশোরে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এখন সরকারের অনুমতি পেলে দ্রুতই দরপত্র আহ্বানের কার্যক্রম শুরু করা হবে।’

বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ পাঁচ বছরের এক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে সরকারের কাছে। ওই কর্মপরিকল্পনায় ১০০ দিনের মধ্যে উৎপাদন-বণ্টন চুক্তির আওতায় স্থলভাগ ও সমুদ্র অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে মডেল পিএসসি ২০২৬ চূড়ান্তকরণের কথা বলা হয়। যা জ্বালানি বিভাগ এরই মধ্যে চূড়ান্ত করেছে। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্থলভাগ ও সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে বিডিং রাউন্ড আহ্বান করার কথা তুলে ধরা হয়। এ কর্মপরিকল্পনায় আরো রয়েছে সাইসমিক ডেটা অ্যাকুইজিশন শেষ করা, ৫০০ লাইন কিলোমিটার টুডি সাইসমিক সার্ভে, ভোলার চরফ্যাশন এলাকায় থ্রিডি সাইসমিক সার্ভে এবং স্থলভাগে সিলেট অঞ্চলে লালাবাজার, গোয়াইনঘাট, কৈলাসটিলা সাউথ ও ফেঞ্চুগঞ্জ ওয়েস্ট স্ট্রাকচার সার্ভে করা।

দেশে জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ফেব্রুয়ারিতে আইন মন্ত্রণালয় অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট-২০২৬-এর খসড়া যাচাই করার পর দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ হয়েছে। অফশোর ও অনশোরে আইন মন্ত্রণালয় বেশকিছু বিষয়ে জানতে চেয়েছে। সেসব বিষয়ে তথ্যও এরই মধ্যে পেট্রোবাংলা থেকে সরবরাহ করা হয়েছে।

নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ১১ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন চলছে। এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এলএনজির দাম জাপান-কোরিয়া মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় সাড়ে ১৬ ডলারের কাছাকাছি চলে গেছে। স্পট মার্কেট থেকে বাংলাদেশ প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি সর্বশেষ ২১ ডলারে কিনেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল-গ্যাস সংগ্রহ ক্রমেই কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।

পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহের তথ্যে দেখা গেছে, প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য হারে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। ২০২০ সালে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে দেশীয় কূপগুলো থেকে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করা যেত প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেটি কমে গতকাল সরবরাহ নেমেছে ১ হাজার ৭০১ মিলিয়ন ঘনফুটে। গত ছয় বছরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় বাড়তি চাহিদা পূরণে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। দেশে মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট থাকলেও গতকাল এলএনজিসহ জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হয় ২ হাজার ৫৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহে বড় ঘাটতি থাকায় শিল্প-কারখানা, আবাসিক, বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সব ক্ষেত্রেই গ্যাসের সংকট চলছে।

সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে। ওই দরপত্রের চূড়ান্ত সময়সীমা ছিল নয় মাস। সংশ্লিষ্ট সময়ে সাতটি কোম্পানি তেল-গ্যাসের নথি কিনলেও শেষ পর্যন্ত কোনো কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। পেট্রোবাংলা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সে সময় জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে দেশের অফশোরে বিদেশী অনেক কোম্পানির আগ্রহ থাকলেও দরপত্রে অংশ নেয়নি। তবে বহুজাতিক দুটি কোম্পানির সঙ্গে গত বছরের এপ্রিলে বণিক বার্তা যোগাযোগ করলে তারা জানায়, সাগরে দরপত্র আহ্বানে পেট্রোবাংলা যে পিএসসি তৈরি করেছে, সেখানে তেল-গ্যাসের দামে বৈশ্বিক কোম্পানিকে আকর্ষণ করার মতো তেমন কিছু নেই। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সাগরে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস রয়েছে—এমন সম্ভাবনা পেট্রোবাংলার তথ্য-উপাত্তে পাওয়া যায়নি বলেও দাবি এসব বহুজাতিক কোম্পানির।

দেশের সমুদ্রসীমায় আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানে বিদেশী কোম্পানির সাড়া না দেয়ার বিষয়টি নিয়ে কাজ করে পেট্রোবাংলা। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারও নতুন করে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বানের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরে। যদিও সে সরকার তাদের ১৮ মাসের মেয়াদে আর নতুন করে দরপত্র আহ্বানে জোরালা কোনো তৎপরতা দেখাতে পারেনি।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, নতুন পিএসসি মডেল চুক্তিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে গ্যাসের দাম নির্ধারণ পদ্ধতি, পাইপলাইন ব্যয়ের পুনরুদ্ধার, কাজের বাধ্যবাধকতা এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে অবদানের ক্ষেত্রে বেশকিছু সংস্কার আনা হয়েছে। গ্যাসের দাম আগের উচ্চ সালফার ফুয়েল অয়েল সূচকের বদলে এখন থেকে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম নির্ধারণ হবে ব্রেন্টের তিন মাসের গড় দামের ১১ শতাংশ (৭০ থেকে ১০০ ডলার ব্যারেল সীমা ধরে)। অগভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে হার হবে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। স্থলভাগের সমতল এলাকায় ৮ শতাংশ এবং পাহাড়ি এলাকায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া পাইপলাইন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আলোচনা সাপেক্ষ ট্যারিফ চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে বাধ্যতামূলক অবদানও ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে আসন্ন দরপত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ব্লকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে না বলে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের গ্যাস অনুসন্ধানে স্থলভাগ ও সাগরে দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নতুন সরকারের যুগান্তকারী উদ্যোগ। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানি দেশের অভ্যন্তরে বিস্তৃত আকারে অনুসন্ধান চালালে আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হবে। বড় ধরনের কোনো গ্যাসের মজুদ পাওয়া গেলে ব্যয়বহুল এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমে আসবে। সেই সঙ্গে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় দেশের জ্বালানি খাতের অনুসন্ধান কার্যক্রমের তৎপরতাও উঠে আসবে।’