Image description

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে সরকার এখনো বিপাকে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের তেলের সংকটও দীর্ঘ হবে। তাই সরকার রাশিয়া থেকে ৫ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিধিনিষেধ না থাকলে বাংলাদেশ এই তেল কিনতে চায় রাশিয়া থেকে। এজন্য ইতোমধ্যে জ্বালানি বিভাগ ঢাকাস্থ রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেছে। তিনি জ্বালানিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চিঠিও দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সরকার বিভিন্ন উৎসের সন্ধানে আছে। রাশিয়াও তার একটি। রাশিয়ার তেল তুলনামূলক সস্তা। এ কারণে সরকার তাদের পরিশোধিত তেল কিনতে আগ্রহী। তবে সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।

এদিকে বাংলাদেশমুখী দুটি তেলবাহী জাহাজ ছেড়ে দিতে ইন্দোনেশিয়া সরকারকে অনুরোধ করবে সরকার। ওই সরকারের বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিএসপির দুটি জাহাজ দেশে আসতে পারছে না। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে ইন্দোনেশিয়া ওই তেল ছাড়ছে না বলে বিপিসিকে জানিয়েছে বিএসপি। ৩০ হাজার টন তেলের ওই দুই জাহাজের একটি ১৫ মার্চ আসার কথা ছিল, আরেকটি আসার কথা ২৪ মার্চ।

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর তেলের দাম কেবলই বাড়ছে। কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের রিফাইনারিতে হামলা হয়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ দিন দিন কমে আসছে।

বিপিসি জানিয়েছে, চলতি মাস অর্থাৎ মার্চের জন্য ইতোমধ্যে ৭টি জাহাজ তেল খালাস করে গেছে। আগামী সপ্তাহে আরও কয়েকটি জাহাজ আসার কথা। সব মিলিয়ে এই মাস মোটামুটিভাবে সামাল দেওয়া যাবে। কিন্তু এপ্রিলে কী হবে। প্রতিমাসে সাড়ে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল লাগে বাংলাদেশে। যার ৯৫ শতাংশের বেশি আমদানি করে চাহিদা মেটানো হয়। এপ্রিলের জন্য ৩০ হাজার টনের তিনটি জাহাজ এ পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকি ১৪টির মতো জাহাজ বা পার্সেল দিতে সম্মত হয়েছে সরবরাহকারীরা। কিন্তু জাহাজে তেল লোড করে রওয়ানা দেওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারছে না বিপিসি। যুদ্ধের কালো ছায়া আরও ছড়াতে থাকলে তেলের সংকট আরও বাড়বে বলে মনে করেন বিপিসির কর্মকর্তারা। এ কারণে রাশিয়ার তেলের ব্যাপারে আগ্রহী সরকার। কারণ বিশ্বে এই মুহূর্তে রাশিয়ার পরিশোধিত তেলই তুলনামূলক সহজলভ্য।

সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১১ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সমুদ্রে থাকা রাশিয়ার তেল কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। বাংলাদেশ (যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আপত্তি না থাকে) এই সময়ে রাশিয়ার তেল কিনতে আগ্রহী। বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, রাশিয়ার তেল অন্য তেলের চেয়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কম দামে পাওয়া যায়। তবে রাশিয়া থেকে কোনোভাবেই অপরিশোধিত তেল কিনতে পারবে না বাংলাদেশ। কারণ বাংলাদেশের একমাত্র পরিশোধন প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারির রাশিয়ার তেল পরিশোধনের মতো সক্ষমতা নেই। জানা গেছে, সরকার আগামী সপ্তাহের মধ্যে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল সংগ্রহে ঈদের বন্ধেও জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসির কিছু কিছু বিভাগ খোলা থাকতে পারে।

ইরান সরকারকে চিঠি : হরমুজ প্রণালি দিয়ে আগামী এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের তিনটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ এবং কয়েকটি এলএনজির কার্গো ছেড়ে দিতে ইরান সরকারকে ১৫ মার্চ চিঠি দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ওই চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য কেনা অপরিশোধিত তেল নিয়ে ১ লাখ টনের জাহাজ এমটি নরডিক পুলাক্স (ভাড়া করা) সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে ৩ মার্চ থেকে অপেক্ষা করছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার জন্য সেটি পার হতে পারছে না। এছাড়া মার্চের শেষে আরও ১ লাখ টনের অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ইউএই-এর ফুজাইরা বন্দর থেকে এবং এপ্রিলে আরও ১টি এক লাখ টনের জাহাজ সৌদি আরবের ইয়ুনবু বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে আসবে। এছাড়া কাতার, ওমান থেকে কয়েকটি এলএনজির কার্গো আসতে পারে। ওই চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে ওই সহায়তা চায় ইরানের কাছ থেকে। যাতে বাংলাদেশের মানুষ ঠিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ পেতে পারে। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এটি একটি জরুরি ইস্যু। চিঠিটি পররাষ্ট্র সচিব ছাড়াও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহে ঢাকাস্থ ইরানের রাষ্ট্রদূত জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে হরমুজ দিয়ে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছেন। হরমুজ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবহণ করা হয়। যার পরিমাণ দৈনিক ২ কোটি ব্যারেল। এই হরমুজ বন্ধ থাকার কারণে এখন তেলের বাজার হু-হু করে বাড়ছে।

প্রতি লিটারে ভর্তুকি ৬০ টাকা : জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া। সর্বশেষ ১৩ মার্চের হিসাবে বিপিসিকে প্রতি লিটার তেল কিনতে হয়েছে ১৬০ টাকার বেশি দামে। অথচ বিক্রি করছে ১০০ টাকা লিটার। অর্থাৎ প্রতি লিটারে সরকারের লোকসান ৬০ টাকা। ওই দিন প্ল্যাটসের দাম অনুযায়ী প্রতি ব্যারেল পরিশোধিত ডিজেলের দাম ছিল ১৮৮ ডলার। এর সঙ্গে ৫ ডলারের বেশি পরিবহণ খরচ। এর বাইরে প্রতি লিটারে ১১ টাকার বেশি আমদানি শুল্ক। সেই হিসাবে বিপিসিকে এখন ডিজেল কিনতে হচ্ছে ১৬০ টাকা প্রতি লিটার। কেরোসিন তার চেয়ে বেশি। ১৩ মার্চের হিসাবে কেরোসিন প্রতি ব্যারেল ১৯৪ ডলার, ফার্নেস অয়েল প্রতি টন ৭৪১ ডলার এবং নাফতা প্রতি ব্যারেল ১২২ ডলার।

বেশি দামে কিনলেও আপাতত তেলের দাম বাড়বে না বলে জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি রোববার এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি তেলের এই বাড়তি মূল্য যতক্ষণ সহ্য করতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তেলের দাম বাড়ানো হবে না।

সরকার সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেলের দাম নির্ধারণ করেছিল। ওই সময়ে সরকারের ডিজেল ক্রয়মূল্য ছিল ৯৯ টাকা ৮০ পয়সা। যুদ্ধের পর এই দাম দ্বিগুণ হয়েছে।