ঢাকার ধামরাইয়ের বিজয় নগর এলাকায় গত ১০ মার্চ গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। চা বানাতে ম্যাচ দিয়ে চুলা জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণ ঘটে আগুন ধরে যায়। ৬ মার্চ রাজধানীর উত্তরায় গ্যাসের পাইপলাইন লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের নারী-শিশুসহ ১০ জন দগ্ধ হয়েছেন। এতে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের হালিশহরের বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে নারী-শিশুসহ ৯ জন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিন ভাই ও দুই স্ত্রীসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে তিন শিশু হাসপাতালের বিছানায় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এমন একটি বা দুটি নয়, প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসলাইন কিংবা সিলিন্ডার লিকেজ ও বিস্ফোরণে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। এসব দুর্ঘটনায় শিশু ও নারীসহ অকালেই ঝরে পড়ছে অনেক প্রাণ। যারা বেঁচে থাকেন তাদেরকে আজীবনের জন্য বরণ করতে হয় পঙ্গুত্ব। এমন দুর্ঘটনায় কখনো করুণ মৃত্যু ঘটে একটি পরিবারের সব সদস্যের।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা বেশি ঘটলেও এখন অনেক কমেছে। বর্তমানে নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর বা ভালভ থেকে গ্যাস লিক হয়ে জমে থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। গত ৬ বছরে সারা দেশে সংঘটিত দেড় লাখ অগ্নিকাণ্ডের একটি বড় অংশই ছিল গ্যাস দুর্ঘটনা সংক্রান্ত। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে আড়াই হাজারের বেশি দগ্ধ রোগী ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ সিলিন্ডার ও গ্যাস লিকেজ দুর্ঘটনার শিকার।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হলেও অধিকাংশ দুর্ঘটনা মূলত লিকেজ থেকে ঘটে। নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজল ও ভালভ ব্যবহারের কারণে লিকেজ সৃষ্টি হয়। এছাড়া ঘরে গ্যাসের গন্ধ তেমন টের না পাওয়ায় বাসিন্দারা সময়মতো সতর্ক হতে পারেন না। সাধারণ মানুষ সচেতন হলে অনেক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, গত বছর সারা দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ২৭ হাজার ৫৯টি। এই হিসাবে দিনে গড়ে ৭৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পরিসংখ্যান মতে, গত বছর শুধু গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৯২০টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে গ্যাস সরবরাহ লাইন লিকেজ থেকে ৫৬২টি এবং গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ১২১টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, রাজধানীতে অগ্নিদুর্ঘটনার প্রায় ৩০ ভাগই গ্যাসের পাইপলাইনের ছিদ্র থেকে ঘটে। বিভিন্ন শহরে যে গ্যাস সরবরাহ লাইন সম্প্রসারিত হয়েছে, তার ৭০ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। খোদ রাজধানীতে অর্ধশত বছরের পুরোনো লাইনও রয়েছে। যেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণে তিতাস কর্তৃপক্ষের অনীহা ও গাফিলতির অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা।
দুর্ঘটনার চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে বাসাবাড়ি বা আবাসিক ভবনে। গত বছর সারা দেশে বাসাবাড়িতে ৮ হাজার ৭০৫টি আগুন লাগে, যা মোট আগুনের ৩২.১৭ শতাংশ। এতে ৮৫ জন নিহত ও ২৬৭ জন আহত হয়েছেন। তথ্যে আরও দেখা গেছে, সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা বর্তমানে অনেকাংশে কমেছে। তবে এ সময়ে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিদুর্ঘটনা কয়েকগুণ বেড়েছে। বড় বড় দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত কমিটি নানা সুপারিশ করলেও কোনোটি বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না। বেশ কয়েকটি তদন্ত প্রতিবেদনে গ্যাসলাইন ও রাইজার নিয়মিত পরীক্ষা, গ্যাস নিঃসরণ চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং নগরবাসীর মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা কার্যক্রম জোরদার করতে বলা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের পুরোনো তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ, বিস্ফোরণ ও লাইন লিকেজের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ২১৩টি। এর মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজে দুর্ঘটনা ৭০৪টি, সরবরাহ লাইনের লিকেজে অগ্নিকাণ্ড ৪৬৫টি এবং বিস্ফোরণের ঘটনা ৪৪টি। এতে ক্ষতি হয়েছে ৯১ লাখ ৭৮ হাজার ৩২৪ টাকার। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, দুর্ঘটনার আগে গ্যাস লিকেজ বা ঘরে জমে থাকা গ্যাসের বিষয়টি তারা টের পাননি। রান্নার সময় হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে মুহূর্তের মধ্যে সবার শরীরে আগুন ধরে গেছে।
ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের তথ্যনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে ২ হাজার ৭০০ জন দগ্ধ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এসব রোগীদের বড় অংশই সিলিন্ডার ও গ্যাস লিকেজ দুর্ঘটনার শিকার। ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান যুগান্তরকে বলেন, গ্যাসের আগুন খুবই বিপজ্জনক। এটি মুহূর্তের মধ্যে পুরো ফ্ল্যাট বা বাসায় ছড়িয়ে পড়ে পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে দগ্ধ করে। গ্রীষ্মকালের তুলনায় শীতকালে এ ধরনের আগুন ও প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে।
বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের মতে, ঢাকা শহরের অনেক এলাকায় ৪০ থেকে ৫০ বছরের বেশি সময়ের পুরোনো গ্যাস বিতরণ লাইন রয়েছে। এসব লাইনের সংস্কার ও তদারকির দায়িত্ব তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এসব গ্যাস লাইনের সংস্কার ও তদারকি যথাযথভাবে হচ্ছে না। এ ছাড়া বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত চুলার সঙ্গে গ্যাসলাইনের সঠিক সংযোগ এবং এলপিজি সিলিন্ডারের সঙ্গে চুলার ফিটিংস সঠিকভাবে না হওয়ার কারণেও অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনা বেড়ে চলেছে।
তারা আরও বলেন, শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, গ্যাসের দুর্ঘটনার জন্য নাগরিকরাও অনেকাংশে দায়ী। সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিলের সময় সঠিক নিয়ম না মানা, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করা, মানহীন সুরক্ষা যন্ত্রাংশ ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার, ভুলভাবে সিলিন্ডার রাখা এবং রান্না শেষে চুলা বন্ধ না করা দুর্ঘটনার বড় কারণ।
এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশে এলপিজি আমদানি ও বোতলজাতকরণে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অর্ধশত। এর মধ্যে বর্তমানে এলপিজি আমদানি করছে মাত্র ৯ থেকে ১০টি কোম্পানি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণে সরকারি-বেসরকারি সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। যারা মান নিয়ে কাজ করছে, তাদের সঠিক সক্ষমতা ও সততা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকায় একাধিক পরিবার অভিযোগ করেন, তিতাস কর্তৃপক্ষ একবার লাইন বসানো ও সংযোগ দেওয়ার পর আর কখনো খোঁজ নিতে আসে না। অনেক সময় গ্রাহকরা তাদের সহায়তা চেয়ে না পেয়ে বাধ্য হয়ে আনাড়ি মিস্ত্রি দিয়ে মেরামতের কাজ করেন।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির যাত্রাবাড়ী এলাকার মাঠ পর্যায়ের দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, অবৈধভাবে গ্যাসের সংযোগ নেওয়া লাইনগুলোতেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। একইভাবে পুরোনো লাইনের যথাযথ তদারকি ও নিয়মিত সংস্কার না হওয়াও দুর্ঘটনার কারণ। তারা আরও বলেন, তিতাসের ভোক্তা শ্রেণি অনেক বিশাল হওয়ায় পুরোনো সব লাইন একবারে সংস্কার ও পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবুও গুরুত্ব ও পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা নিয়মিত সংস্কার কাজ পরিচালনা করছেন।
জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরিদর্শক মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, মূলত জনসচেতনতা না থাকার কারণে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। অনেকে নিম্নমানের সিলিন্ডারের কথা বললেও সেগুলোতে কমপক্ষে ১০ বছর মেয়াদ থাকে। তার মতে, সিলিন্ডারের গায়ে সব নিয়ম দেওয়া থাকে, কিন্তু অনেকে সেগুলো পড়েও দেখেন না।
ফায়ার সার্ভিসসহ দুর্ঘটনা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, গ্যাস সংক্রান্ত দুর্ঘটনা কমাতে রান্নাঘরে ভেন্টিলেশনের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ থাকলে এবং গ্যাসলাইনে লিকেজ থাকলে, সেখানে গ্যাস জমে থাকে। তখন যে কোনো স্পার্ক বা ম্যাচের কাঠি জ্বালালেই বিস্ফোরণ ঘটে আগুন ধরে যায়। এ জন্য রান্নাঘরের জানালা খুলে রেখে আলো-বাতাস প্রবেশ করালে গ্যাসের দুর্ঘটনা অনেক কমবে।