Image description
‘রিকশাচালক হত্যার’ গুজব ছড়িয়ে তাণ্ডব

রাজধানীর উত্তরায় ‘এক রিকশাচালককে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ গুম’ করা হয়েছে-এমন গুজব ছড়িয়ে ‘উত্তরা স্কয়ার’ নামে একটি বহুতল শপিংমলে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। চালানো হয়েছে তাণ্ডব। রোববার গভীর রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত উত্তরা-১৩ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথ এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। উত্তেজিত রিকশাচালক ও বহিরাগতদের হামলায় মার্কেটের নিচতলার বেশ কয়েকটি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, কোনো রিকশাচালক নিহত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গুজবকে কেন্দ্র করেই এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। রোববার রাতের ওই ঘটনার পর ১২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। সোমবার রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে উত্তরা স্কয়ার শপিংমলের সামনে রিকশা দাঁড় করানোকে কেন্দ্র করে এক রিকশাচালকের সঙ্গে মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী আনিসুজ্জামানের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীরা ওই চালককে মারধর করেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিষয়টি মীমাংসা হয়। রিকশাচালক চলে গেলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়ে-রিকশাচালককে মার্কেটের ভেতরে আটকে রেখে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি লাশ গুম করা হয়েছে। এই গুজব মুহূর্তেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শত শত রিকশাচালক ও বহিরাগত লাঠিসোঁটা নিয়ে মার্কেটের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালায়। উত্তেজিত লোকজন উত্তরা স্কয়ার ঘিরে ফেলে। দফায় দফায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে কাচ ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে মার্কেটের সামনে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সুযোগে স্থানীয় সংঘবদ্ধ চক্র মার্কেটের ভেতরে ঢুকে কয়েকটি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। বিভিন্ন দোকান থেকে লুট করে নিয়ে যায় লাখ লাখ টাকার মালামাল। জানা গেছে, উত্তরা স্কয়ার শপিংমলটির মালিক মৌলভীবাজার-৪ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ-সদস্য হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরী।

সোমবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, মার্কেটের নিচতলায় ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা কাচ, ইটপাটকেল ও ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের মালামাল। মার্কেটের প্রধান প্রবেশদ্বারের গেট ভেঙে গেছে। কয়েকটি দোকানের শোকেস ও কাচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে আছে। খাজানা ও কে জেড নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের দোকানের মেঝেতে ইমিটেশন গহনা, জুতা, কসমেটিকসহ নানা পণ্য ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ মালামালই লুট হয়ে গেছে। হামলাকারীরা যে যেভাবে পারছে মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। মার্কেটের ‘খাজানা’ আউটলেটের বিপণনকর্মী রাব্বি বলেন, ঘটনার কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে সবাইকে সরিয়ে দেয়। রাত ১২টার দিকে তারা দোকান বন্ধ করে পেছনের গেট দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই একদল লোক আবার মার্কেটে হামলা চালায় এবং এরপর থেকেই তাণ্ডব শুরু হয়। এতে তাদের দোকানের অনেক মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লুট করে নিয়ে গেছে অনেক মালামাল। মার্কেটের একটি স্বর্ণের দোকানের ম্যানেজার মাসুম জানান, খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে মার্কেটে এসে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখেন তিনি। আশপাশের সড়কে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে আছে লাঠিসোঁটা নিয়ে। সড়কের ওপর আগুন জ্বলতেও দেখা যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ এলেও তারা প্রথমে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এতে হামলাকারীরা আরও আস্কারা পায়। পরে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে এলে পুলিশ তৎপর হয়। এ সময় ঢাকা-১৮ আসনের এমপি এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনিও প্রচেষ্টা চালান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার। কিন্তু আন্দোলনকারীরা কিছুতেই থামতে না চাইলে পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে অ্যাকশনে যায়। রাত ৩টার দিকে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। এরপর যৌথ বাহিনী পুরো মার্কেট তল্লাশি চালিয়ে নিশ্চিত হয়, ভেতরে কোনো লাশ বা আটক ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই।

মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী আনিসুজ্জামান বলেন, এক রিকশাচালক পার্কিং গেটের সামনে রিকশা দাঁড় করিয়ে রাখেন। পাশেই একটি পুলিশের গাড়ি ছিল। তাকে কয়েকবার সরে যেতে বলা হলেও তিনি সরেননি। একপর্যায়ে রিকশায় লাঠি দিয়ে আঘাত করলে ওই চালক অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল শুরু করেন। একপর্যায়ে তার সঙ্গে আমার হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে মার্কেটের প্রটোকল কর্মকর্তা ‘মঞ্জু স্যার’ এসে বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। এরপর রিকশাচালক সেখান থেকে চলে যান। কিন্তু কিছুক্ষণ পর কয়েকজন যুবক এসে ‘মঞ্জু স্যারকে’ মারধর করেন। তখন তাদের একজনকে ধরে মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মার্কেটের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

উত্তরা স্কয়ারের এজিএম ফয়সাল আহমেদ বলেন, যে রিকশাচালককে ঘিরে ঘটনার সূত্রপাত, তিনি হাতাহাতির পরই সেখান থেকে চলে যান। কিন্তু কিছুক্ষণ পর এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ওই রিকশাচালককে হত্যা করা হয়েছে। এই গুজবকে কেন্দ্র করেই বহিরাগতদের একটি দল মার্কেটে হামলা চালায়। হামলাকারীরা সবাই বাইরের লোক বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, ওই সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

প্রত্যক্ষদর্শী এনায়েত উল্লাহ বলেন, ওই রিকশাওয়ালার সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীর বাগ্বিতণ্ডার সময় আমিও ঘটনাস্থলে ছিলাম। ওই রিকশাওয়ালা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই এমন মব তৈরি হয়।

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মো. রফিক আহমেদ বলেন, শপিংমলের নিরাপত্তাকর্মী ও এক রিকশাচালকের মধ্যে সাধারণ কথা কাটাকাটি থেকে এই ঘটনার সূত্রপাত। পরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে একজন রিকশাচালক নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, কোনো নিহত ব্যক্তির পরিচয় কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি।

কোনো হাসপাতাল বা এলাকা থেকেও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। এটি গুজব বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, এই ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্তের কাজ চলছে। আমরা ১২ জনকে আটক করেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এই ঘটনায় তৃতীয় কোনো পক্ষের ইন্ধন আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওসি জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তাদের দুই পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এম নজরুল ইসলাম বলেন, গুজবকে কেন্দ্র করে কিছু দুর্বৃত্ত মার্কেটে তাণ্ডব ও লুটপাট চালিয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হচ্ছে।

উত্তরা স্কয়ার মার্কেট কর্তৃপক্ষের দাবি, এই হামলায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সামনে ঈদকে ঘিরে ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকান মালিক বলেন, নিরাপত্তাকর্মীদের ভুল থাকতে পারে, কিন্তু ‘লাশ গুমের’ মতো গুজব ছড়িয়ে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে, তা অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে এনেছে। তিনি জানান, সঙ্ঘবদ্ধ চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মব তৈরি করেছিল মার্কেট লুটপাট করার উদ্দেশ্যে। এর আগেও উত্তরায় মব তৈরি করে আরেকটি মার্কেট লুটের চেষ্টা চালানো হয় বলে জানান তিনি।

সোমবার সকালে সোনারগাঁও জনপথ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটটি পুলিশ ঘিরে রেখেছে। নতুন করে কেউ জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এদিকে আশপাশের আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের মাঝেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বলছেন, থানার অদূরে এমন সহিংসতা ঘটায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, গুজবকে কেন্দ্র করে স্বার্থান্বেষী একটি মহল পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে মার্কেটে হামলা ও লুটপাটের চেষ্টা করেছে। গোয়েন্দারা এখন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলার নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। প্রশাসনের মতে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গুজবের ভিত্তিতে এমন সহিংসতা নগর নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তাই গুজব রটনাকারী ও হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।