ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিম আল হাসানের (২২) সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ছাত্রী শারমিন জাহান খাদিজা (২৫) গত বছরের ২৪ জুন বিয়ে করেন। পরে তাদের বিয়ের বিষয়টি পরিবারকে জানান। এরপর একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তারা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন।
শারমিনের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তাদের বিয়ের কিছুদিন পর থেকে শারমিন ও ফাহিমের মধ্যে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে কলহের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি শারমিন পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন।
গতকাল রবিবার (১৫ মার্চ) ক্যাম্পাস সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকায় ভাড়া বাসা থেকে লোকপ্রশাসন বিভাগের ৫১তম ব্যাচের এই ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
রাতে সন্দেহভাজন হিসেবে ফাহিমকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
এদিকে আজ সোমবার (১৬ মার্চ) সকালে ফাহিমকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত। ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আয়েশা সিদ্দিকা এ আদেশ দেন।
আদালত সূত্র জানায়, রিমান্ড আবেদনসহ ফাহিমকে আদালতে উপস্থাপনের পর তদন্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতে পাঁচ দিনের রিমান্ড শুনানির জন্য আগামী ২৪ মার্চ দিন ধার্য করেন ম্যাজিস্ট্রেট।
চাঁদপুরের কচুয়ায় শারমিনের গ্রামের বাড়ি। আজ দুপুরে চাঁদপুরের কচুয়া উত্তর ইউনিয়নের তেতৈয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে তেতৈয়া গ্রামের মোল্লাবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যা বলছে শারমিনের পরিবার ও প্রতিবেশী
শারমিন জাহান খাদিজা কচুয়া উপজেলার ৬নং কচুয়া উত্তর ইউনিয়নের তেতৈয়া গ্রামের মোল্লাবাড়ির সৌদি প্রবাসী শাহজাহান মোল্লার মেয়ে। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী ছিলেন
নিহত খাদিজার মা ফরিদা ইয়াছমিন বলেন, পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদ উদযাপন করতে ঘটনার দিনই (রবিবার) সকালে খাদিজার চাঁদপুরের কচুয়া উত্তর ইউনিয়নের তেতৈয়া গ্রামের বাড়ির আসার কথা ছিল। আমার মেয়ের ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তার নিথর দেহ বাড়িতে এসেছে।
তিনি বলেন, মেয়েকে প্রায়ই অত্যাচার করতো জামাই। তাকে হত্যার আগের দিন শনিবার মেয়ের সাথে কথা হয়। ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে মেয়ে আমাদের বাড়িতে আসবে। ওইদিন সেহেরি খাওয়ার সময় তাকে ফোন করা হলে কল রিসিভ করে জামাই। আমি তাকে বলি খাদিজাকে ফোনটি দেও, খাদিজার সাথে কথা বলব। জামাই বাহানা করে বলে- খাদিজা রান্না করছে। সেহেরির সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে পরে কথা বলবে। এ সময় সে ফোনের সংযোগটি কেটে দেয়। সকালে মেয়ের নম্বরে ফোন করা হলে কল ঢোকে না, তাই জামাইকে ফোন করি। প্রতি উত্তরে জামাই বলে আমি বাসা থেকে বের হয়ে গেছি। এখন ঢাকায় আছি। খাদিজার শরীরের প্রেসার কমে গেছে, সে অসুস্থ। এ কারণে হয়তো ফোন ধরছে না। এরপর বিকেলে শুনি আমার মেয়ে আর নেই। সে আমার মেয়েকে হত্যা করেছে। আমি এই হত্যার ন্যায়বিচার চাই।
নিহত শারমিন জাহান খাদিজার চাচা ও মামলার বাদী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন সকালে খাদিজার স্বামী ফাহিম আল হাসানকে ফোন করি। খাদিজার ফোনে কথা বলতে চাইলে তার স্বামী ফাহিম আল হাসান জানায় সে ঘুমিয়ে আছে। পরে কথা বলবে। এই বলে সে ফোনের লাইন কেটে দেয়। বিকেলে আমরা জানতে পারি খাদিজা মারা গেছে। এটা একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার চাই।
কচুয়া উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইউসুছ মোল্লা বলেন, এ ঘটনায় আমরা শোকাহত। ধারণা করা হচ্ছে এটি হত্যাকাণ্ড। এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার দাবি করছি।
মামলার এজাহারে যা বলা হয়েছে
শারমিনের স্বামী ফাহিম আল হাসান কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার খুইরুল গ্রামের মো. হানিফ সরকারের ছেলে। এ ঘটনায় নিহত শারমিন জাহান খাদিজার চাচা ও মামলার বাদী মো. মনিরুল ইসলাম আশুলিয়া থানায় একটি মামলা করেছেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহত শারমিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। তার স্বামী ফাহিম আল হাসান ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। প্রেমের সম্পর্কের পর শারমীন ও ফাহিম গত বছরের ২৪ জুন বিয়ে করে বিষয়টি পরিবারকে জানান। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তারা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। বিয়ের কিছুদিন পর থেকে শারমিন ও ফাহিমের মধ্যে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে কলহের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি শারমিন পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১৫ মার্চ বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে ফাহিম মুঠোফোনে শারমিনের চাচা মনিরুল ইসলামকে শারমিন গুরুতর অসুস্থ জানিয়ে তাকে বাসায় আসতে বলেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মনিরুল শারমিনকে খাটের ওপর রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর আশপাশের লোকজনের সহায়তায় শারমিনকে সাভারের বেসরকারি এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সুরতহালের তথ্য জানিয়ে এজাহারে উল্লেখ করা হয়, শারমিনের কপালের ডান পাশে, মাথার উপরে গভীর কাটা রক্তাক্ত জখম দেখতে পান।