Image description

Meer Zahan মীর জাহান

 
 
মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, "জনরায় কে সম্মান করতে হবে, তবে তা সাংবিধানিকভাবে, রাষ্ট্র আবেগ দিয়ে চলে না, রাষ্ট্র চলে সাংবিধানিক নিয়মে।"
কথাটি আংশিকভাবে সত্য হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল দর্শন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শেষ পর্যন্ত জনগণের রায়ই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ভিত্তি, আর সংবিধান সেই রায়েরই লিখিত রূপ। অর্থাৎ সংবিধান জনগণের জন্য, জনগণ সংবিধানের জন্য নয়।
 
Constitution of Bangladesh-এর ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষ থেকেই সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়। এর অর্থ হচ্ছে, সংবিধান নিজেই স্বীকার করছে যে ক্ষমতার উৎস জনগণ। যদি জনগণই ক্ষমতার উৎস হয়, তাহলে তাদের মতামত বা রায় সংবিধানের চেয়েও মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। সংবিধান সেই ভিত্তিকে সংগঠিত করার একটি কাঠামো মাত্র।
বিশ্ব ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যে জনরায় সংবিধান পরিবর্তন করেছে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের বিপুল রায় এবং পরবর্তী স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয়ের ফলেই একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং পরে ১৯৭২ সালে নতুন সংবিধান প্রণীত হয়। অর্থাৎ প্রথমে জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে, তারপর সেই ইচ্ছার ভিত্তিতে সংবিধান তৈরি হয়েছে।
একইভাবে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে গণভোট বা নির্বাচন জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পথ খুলে দেয়। জনগণের ইচ্ছাই রাজনৈতিক বৈধতার মূল উৎস, এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা, যাকে বলা হয় জনসার্বভৌমত্ব (Popular sovereignty)।
 
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ সরাসরি সব সিদ্ধান্ত নেয় না; তারা প্রতিনিধি নির্বাচন করে। বাংলাদেশে সেই প্রতিনিধিরা বসেন জাতীয় সংসদে। জনগণ ভোট দিয়ে যাদের সংসদে পাঠায়, তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের ইচ্ছা ও স্বার্থকে আইনে রূপ দেওয়া।
 
সুতরাং, যদি জনগণের সুস্পষ্ট মতামত বা জনমত কোনো পরিবর্তনের দাবি তোলে, তবে সেই প্রতিনিধিদের ওপর নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পড়ে সংবিধান সংশোধন করার। সংবিধান পরিবর্তনের ব্যবস্থাও জনগণের ইচ্ছার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানেই সংশোধনের বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সংবিধান নিজেই স্বীকার করে যে সময়, সমাজ ও জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী এটি পরিবর্তিত হতে পারে। এই সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেওয়া হয়েছে, যা মূলত জনগণের প্রতিনিধিদের হাতেই ন্যস্ত। জনগণ যাদেরকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে তাদেরই দায় জনগণের রায়কে সাংবিধানিক রূপ দেওয়া। সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনরায় কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।
র্ণ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ জনগণের ইচ্ছা। সংবিধান সেই ইচ্ছাকে সংগঠিত ও কার্যকর করার একটি আইনি কাঠামো মাত্র। জনগণ যেখানে স্পষ্টভাবে তাদের মতামত দিয়েছে, সেখানে সরকারের দায়িত্ব সেই মতামতকে বাস্তবায়ন করা, প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই। কারণ গণতন্ত্রের মূল দর্শনই হলো: জনগণই রাষ্ট্রের মালিক, আর রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের সেবার জন্যই বিদ্যমান।
 
রাষ্ট্র জনগণের, জনগণই নির্ধারণ করে রাষ্ট্র কীভাবে চলবে। অতএব, সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনমতকে উপেক্ষা করার দুঃসাহস দেখাবেন না। শেখ হাসিনার সরকার সাংবিধানিকভাবে বৈধ ছিল, জনগণ সেই সরকার চায়নি বিধায় হাসিনাকে পালাতে হয়েছে। এখানে সংবিধান কোন কাজ করেনি। আশা করছি সবার শুভবুদ্ধির উদয় হবে।