Image description

বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও দেশে তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও সন্তুষ্টি দেখা গেছে। গত ৭ মার্চ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর আলোচনা টেবিলেই থামিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে আতঙ্ক না ছড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন তিনি। পরে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত বাজার মনিটর ও তদারকিতে বাড়েনি জ্বালানি তেলের দাম।

 

সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বের প্রায় ৯৫টিরও বেশি দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশে আপাতত জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এতে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।

 

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার কারণে অনেক দেশেই পরিবহন ব্যয়, পণ্য উৎপাদন খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 
 

 

বিশেষ করে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল এবং কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত থাকায় পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়েনি। এতে কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, ছোট ব্যবসায়ী এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়নি। সাধারণত জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এবং তার প্রভাব পড়ে বাজারের সব ধরনের পণ্যের ওপর। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই চাপ থেকে আপাতত মুক্ত রয়েছে দেশের মানুষ।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখার ফলে বাজারে পণ্যমূল্য কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে। বিশেষ করে কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

রাজধানীর মৎস্য ভবন মোড়ে রমনা পেট্রোল পাম্পে কথা হয় পুরান ঢাকার রড ব্যবসায়ী ও মোটরসাইকেল চালক উজ্জ্বলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যখনই জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়, তখনই সাধারণত দাম বাড়ানো হয়। কিন্তু এবার আমরা ভিন্ন চিত্র দেখছি। তেলের দাম না বাড়ানোর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।’

 

প্রাইভেটকার চালক ইমরান বলেন, ‘সাধারণত সংকট দেখা দিলেই হঠাৎ করে তেলের দাম ১৩০ থেকে ১৫০ হয়ে যায়। কিন্তু এবার সংকটের মধ্যেও দাম স্থিতিশীল রয়েছে, এটা আমাদের জন্য স্বস্তির বিষয়।’

 

বালু ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশে তার ব্যতিক্রম হয়েছে। আমি মনে করি, এটি আমাদের দেশের মানুষের জন্য স্বস্তির খবর এবং সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যও বলা যায়।’

 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। তাই সরকার জনগণের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের প্রস্তুতির কারণে সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। দেশে জ্বালানি তেলের কোনো অভাব নেই।’

 

তিনি আরও জানান, ‘রেশনিং পদ্ধতি তুলে নেওয়া হয়েছে এবং এখন থেকে মানুষ চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল কিনতে পারবেন। এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও কাতারের বাইরে বিকল্প উৎস নিয়ে কাজ করছে সরকার।’

 

এদিকে আজ (রোববার) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, ‘আজ থেকে জ্বালানি তেল বিক্রিতে আর কোনো রেশনিং থাকছে না। সবাই এখন চাহিদা অনুযায়ী তেল কিনতে পারবেন।’

 

তিনি বলেন, ‘দেশে যেন জ্বালানি সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য আমদানি বাড়াতে বিভিন্ন বন্ধুরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে অস্থির থাকলে ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। এ জন্য বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

 

দেশে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানো সরকারের একটি সময়োচিত পদক্ষেপ উল্লেখ করেছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম।

 

তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, সরকারের সদিচ্ছা, আমাদের নিয়মিত বাজার মনিটর ও ভোক্তা সাধারণের সচেতনতা মিলিয়েই বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য আমরা সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছি।