গত ১০ মার্চ রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত পরিবারগুলো প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পাবে, যা উপকারভোগীর পছন্দ অনুযায়ী মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে এই ভাতার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াচ্ছে একের পর এক অপতথ্য, প্রতারণা। দ্য ডিসেন্ট কী–ওয়ার্ড ব্যবহার করে ফেসবুকে গত এক সপ্তাহে (৬ মার্চ–১২ মার্চ) ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে একাধিক ভুয়া তথ্য ও প্রতারণামূলক পোস্ট শনাক্ত করে।
চলছে একাধিক ভুয়া পেইজ
অনুসন্ধানে ‘ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন’, ‘Media Times’, ‘National Family Card’ ও ‘Family Card BD’ নামের অন্তত তিনটি ফেসবুক পেইজ শনাক্ত করা যায়, যেগুলো সম্প্রতি তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘National Family Card’ ও ‘Family Card BD’ পেইজ দুটি যথাক্রমে ৮ ও ৯ মার্চ তৈরি করা হয়। আর ‘ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন’ নামের পেইজটি তৈরি করা হয়েছে ১১ ফেব্রুয়ারি।
ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে প্রতারণা
‘ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন’ এবং Media Times পেইজ দুটোতে একই পোস্ট দুই পেইজেই পোস্ট হতে দেখা যায়। ফ্যামিলি কার্ড ছাড়াও সরকারি এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অর্থ সাহায্যের দাবিতে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, এমনকি টাকাও দাবি করা হয়েছে।
১১ মার্চ করা একটি ফটোকার্ড পোস্টের ক্যাপশনে লেখা ছিল, “সকলেই পাবেন প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার ২৫০০/- আবেদন করলেই।”
ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, “আজকে থেকে সকলকে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার ২৫০০ টাকা দেওয়া হবে। করতে হবে অনলাইনে আবেদন। আবেদন লিংক কমেন্টে।”

পোস্টগুলোর কমেন্ট বক্সে amarportal.xyz/eid-vata এবং https://familycard.online/ নামের দুইটি লিঙ্ক পাওয়া যায়। এতে প্রবেশ করলে ‘এখানে আবেদন করুন’ লেখা একটি বাটন দেখা যায়, যেখানে ক্লিক করার মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে জুয়ার ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হয়।
সাইটগুলোর ডোমেইন যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, গত বছরের ০১ অক্টোবর থেকে এ বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সাইটগুলোর ডোমেইন রেজিষ্ট্রেশন হয়েছে।
মেটার এড লাইব্রেরিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ লিখে সার্চ করলেও এমন একাধিক আবেদনের লিংক সংবলিত পোস্টের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। ১৪ মার্চ এমন অন্তত ১২টি ভিডিওর এড সক্রিয় অবস্থায় দেখা যায়। এসব ভিডিওতে ভিন্ন ভিন্ন ছয়টি ওয়েবসাইটের লিংক দিয়ে সেখানে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদন করতে আহ্বান জানানো হচ্ছে।
ভুয়া আবেদন প্রক্রিয়া ও ফি দাবি
‘National Family Card’ পেইজে ৮ মার্চ করা দুটি ভিডিও পোস্টে (১, ২) “স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড আবেদন করার সম্পূর্ণ নিয়ম | ২৫০০ টাকা ভাতা পাওয়ার উপায়” লেখা ক্যাপশন ব্যবহার করা হয়।

ভিডিওগুলোর শুরুতে অন্য কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ভিডিও কেটে জুড়ে দেওয়া হয়, যারা সাধারণত এ ধরনের আবেদন অর্থাৎ জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচিয়পত্রসহ বিভিন্ন সরকারি পরিষেবার আবেদন সংক্রান্ত নাগরিক সমস্যা সমাধান ও পক্রিয়ার উপর ভিডিও তৈরির জন্য পরিচিত। এরপর ভুয়া আবেদন প্রক্রিয়া দেখিয়ে সর্বশেষ ধাপে ১০৫০ টাকা ফি দেওয়ার কথা বলা হয়।
এছাড়া ‘Family Card BD’ পেইজ থেকে ৯ মার্চ করা একটি ভিডিওতে “ফ্যামিলি কার্ড আবেদন করুন ঘরে বসেই মাত্র ২ মিনিটেই” ক্যাপশন ব্যবহার করা হয়। ভিডিওটির শুরুতে ATN News-এর একটি সংবাদ প্রতিবেদন থেকে খণ্ডিত অংশ যুক্ত করা হয়। এরপর ভুয়া আবেদন প্রক্রিয়া দেখিয়ে ২৫০ টাকা আবেদন ফির কথা উল্লেখ করা। ভিডিওটি ৭৫ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে। পেইজটিতে একই ধরনের আরও দুটি ভিডিও পাওয়া যায়।
সংবাদ ভিডিওর ব্যবহার
Custom Play নামের একটি পেইজ ৯ মার্চ “ফ্যামিলি কার্ড আবেদন ২০২৬ – ৯০% মানুষ এই ভুল করে!” ক্যাপশন ব্যবহার করে একটি ভিডিও পোস্ট করে। ভিডিওটির শুরুতে যমুনা টিভি–র একটি সংবাদ ভিডিওর খণ্ডিত অংশ ব্যবহার করা হয়। পরে আবেদনের জন্য btv99.com নামের একটি ওয়েবসাইটে যেতে বলা হয়, যা আসলে একটি জুয়ার সাইট।
ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকেও ভুয়া প্রচার
১২ মার্চ ‘ফ্যামিলি কার্ড পেজ’ নামের একটি পেইজে ফটোকার্ড পোস্ট করে দাবি করা হয়, “সবাই পাবেন ফ্যামিলি কার্ড, এর আবেদন করুন ঘরে বসে।” পোস্টের ক্যাপশনে একটি ফোন নম্বর দিয়ে নম্বরটির ইমো বা হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
এছাড়া ShamimVa 0.2 ও Md Abdul Matin নামের দুটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় একই ধরনের ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, “ফ্যামিলি কার্ড করলে সবাই পাবেন ২০ হাজার টাকা ঈদ বোনাস।” ক্যাপশনে দেওয়া আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং আবেদন ওয়েবসাইট হিসেবে tcbsheba.com নামের একটি ভুয়া ডোমেইন উল্লেখ করা হয়েছে; ওয়েবসাইটটি দেখতে অনেকটা সরকারি ওয়েবসাইটের মতো করে তৈরি।

ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়া
এ বিষয়ে তথ্য জানতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গেলে একটি বিজ্ঞপ্তি দেখা যায়। সেখানে বলা হয়েছে, “মন্ত্রণালয়ের নামে একটি নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে ফ্যামিলি কার্ড বিষয়ে প্রতারণার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে সকলকে সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য অনুরোধ করা হলো।”
এ বিষয়ে আরও খুঁজতে গেলে ডোমেইনের শেষাংশে gov.bd যুক্ত একটি ওয়েবসাইট পাওয়া যায়, যেটি ফ্যামিলি কার্ড সম্পর্কিত সরকারি একমাত্র অফিশিয়াল ওয়েবসাইট। ওয়েবসাইটটিতে কার্ড সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য থাকলেও সেখানে অনলাইনে আবেদনের কোনো লিংক নেই। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে অনলাইনে আবেদন করার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
এছাড়া ওয়েবসাইটে আবেদনের জন্য কোনো নির্ধারিত ফি-এর কথাও উল্লেখ নেই।
সেখানে প্রদত্ত গাইডলাইন অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদন প্রক্রিয়াটি সরাসরি নাগরিকদের মাধ্যমে নয়, বরং প্রশাসনিকভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সরকারি প্রতিনিধিরা ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত নির্দিষ্ট ওয়ার্ডগুলোতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যোগ্য পরিবার নির্বাচন করেন। পরে সংগৃহীত তথ্য সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে অনলাইনে এন্ট্রি দেওয়া হয় এবং পিএমটি (PMT) স্কোরিংয়ের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। এরপর সমাজকর্মীরা সরেজমিনে গিয়ে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন।
এরপর উপজেলা বা শহর বাস্তবায়ন কমিটি চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদন দিয়ে ডাটাবেজ লক করে। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর কিউআর কোডযুক্ত স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ছাপানো হয় এবং নির্বাচিত সুবিধাভোগীদের মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়।