Image description

২০২৪ সালের আগস্টে ভারী বর্ষণ এবং ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে ফেনী ও নোয়াখালীসহ দেশের এগারো জেলার ৭৩টি উপজেলা। সে সময় বন্যার্তদের সাহায্যার্থে গণত্রাণ সংগ্রহের ঘোষণা দিয়ে ব্যাপক সাড়া পেয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অসংখ্য মানুষ ট্রাকভরে ত্রাণের মালামাল ও অর্থ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) সমবেত হন।

২২ আগস্ট গণত্রাণ সংগ্রহ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর দুই সপ্তাহে ওই তহবিলে প্রায় ১১ কোটি ১০ লাখ টাকা জমা পড়ে। এর মধ্য থেকে বন্যার্তদের সহায়তায় তাৎক্ষণিক খরচ হয়েছে প্রায় এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অবশিষ্ট প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। এছাড়া খাবার-দাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ হয়েছিল, যা প্রায় ১৯১টি ট্রাকে করে বন্যাদুর্গত এলাকায় নিয়ে বিতরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।

এ ছাড়া খাবারসহ সংগ্রহ হওয়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য প্রায় ১৯১টি ট্রাকে করে বন্যাদুর্গত এলাকায় নিয়ে বিতরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। দেশের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বরের পর গণত্রাণ সংগ্রহ কর্মসূচি বন্ধ করার ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

কিন্তু ত্রাণ তহবিলে জমা পড়া সেই অর্থ বন্যার্তদের সহায়তায় ঠিকঠাক ব্যবহার হচ্ছে কি না—তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম হয়। এমনকি বন্যার দেড় বছর পরেও ত্রাণের টাকার হিসাব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

১১ মার্চ ২০২৬ সালে পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন এক ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আব্দুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “হুজুর, খেজুরের হিসাব দিলেন, বন্যার্তদের ১২ কোটি টাকার হিসাব তো দিলেন না। সেটা কবে দেবেন?”

সাম্প্রতিক সময়ে এমন আরও কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানেএখানে এবং এখানে

Bangladesh Online Activist Forum (BOAF) এর প্রেসিডেন্ট Kabir Chowdhury Tanmoy এক পোস্টে বলেন, “বেশি দিন কিন্তু নাই, আজ প্রকাশ্যে তারা—তারাই ধরাধরি! তারা—তারাই ত্রাণের টাকার হিসেব, দুর্নীতির টাকার হিসেব নেওয়ার জন্য পারলে হুহু। এই আসিফ্ফা! ত্রাণের টাকা কই? এই আসিফ্ফা একটা দুর্নীতিবাজ। এটা তাদের লোকজনই তাদের বলছে। কাল পুরো জাতি বললে, ধরলে কি হবে?” 

আওয়ামী লীগের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নিঝুম মজুমদার বলেন, “খেজুর কয় প্যাকেট দিয়েছে সেটা দিয়ে টোকাইটা ভিডিও বানায়। অন্যদিকে জুলাই ফাউন্ডেশনের ১০০ কোটি কিংবা বন্যার ১১ কোটির হিসেব চাইলে টোকাইটা গালি দেয়।”

এছাড়াও, ফেসবুকে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাসুদ কামালের বক্তব্য দাবিতে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। দাবি করা হয়েছে, “সাংবাদিক মাসুদ কামালের প্রশ্ন : খেজুরের হিসাব যেই ভাবে দিলেন বন্যার ১২ কোটি টাকার হিসাব টা পই পই করে দেন। এই হিসাব টা তারা দিবে না কারন এটা ছিলো তাদের দলিও পুজি।” 

তবে, বাস্তবে মাসুদ কামালের এমন মন্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

২০২৪ সালেই ত্রাণের টাকার হিসেব দিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

২০২৪ সালের ১ অক্টোবর গণত্রাণ সংগ্রহ কর্মসূচির ত্রাণ কার্যক্রমের হিসাবসংক্রান্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গণত্রাণের ৯ কোটি ৯১ লাখ ৫১ হাজার ২১৩ টাকা দুটি ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ১ কোটি ৯১ লাখ টাকা দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যাকবলিত জেলাগুলোর মানুষের জন্য খরচ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা।

অ্যাকাউন্টিং ও পেশাদার উপদেষ্টাদের বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক পিকেএফ ইন্টারন্যাশনালের একটি সদস্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত নিরীক্ষার হিসাব প্রকাশ করা হয়। আর পরদিন বুধবার সচিবালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজমের কাছে ত্রাণের আট কোটি টাকার চেক তুলে দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা।

অডিট শেষে ত্রাণ সংগ্রহ কার্যক্রমে কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা পাওয়া যায়নি বলে জানান চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট আজিজ হালিম খায়ের চৌধুরী ও অডিটর গোলাম ফজলুল কবির।

সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা বলেন, মোট ১১ কোটি ৬৯ লাখ ৮৪ হাজার ৪২০ টাকার তহবিল সংগ্রহ হয়েছিল। এর মধ্যে ৯ কোটি ৮৫ লাখ ১৫ হাজার ৪২৫ টাকা নগদ এবং বাকি টাকা মোবাইল ব্যাংকিং, প্রাইজ বন্ড, ডলার ও অন্যান্য মাধ্যমে আসে। এর মধ্যে মোট খরচ হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৩৩ হাজার ২০৭ টাকা। বর্তমানে ব্যাংকের দুটি অ্যাকাউন্টে ৯ কোটি ৯১ লাখ ৫১ হাজার ২১৩ টাকা রয়েছে।

ফজলুল কবির বলেন, “তাঁরা (বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন) জরুরি ভিত্তিতে ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা নিয়েছিলেন। তবে আমরা বলেছি, এগুলো ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে থাকা উচিত নয়। এতে আইনগতভাবে এর মালিকানা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হাতে থাকে না। তাঁরা আমাদের কথা শুনেছেন।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজুর আর রহমান, সমন্বয়ক লুৎফর রহমান ও শিক্ষার্থী মো. ফরিদ উদ্দিনের নামে যৌথভাবে এ অ্যাকাউন্ট খোলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

অডিট রিপোর্টে ত্রাণ বাবদ অবশিষ্ট ৯ কোটি ৯১ লাখ ৫১ হাজার ২১৩ টাকা থাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এর আগে ত্রাণ কার্যক্রম স্থগিত করে ৪ সেপ্টেম্বর জানানো হয়েছিল ১১ কোটি ১০ লাখ ১৩ হাজার ৫৬৯ টাকা আয় এবং ১ কোটি ৭৫ লাখ ১২ হাজার ৭৯৪ টাকা খরচের হিসাব। সেই হিসাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাছে অবশিষ্ট ছিল ৯ কোটি ৩৫ লাখ ৭৭৫ টাকা।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অবশিষ্ট টাকার এই অমিল কেন—এ বিষয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন,“আমাদের আগের হিসাব ৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এরপরও আমাদের কাছে বিভিন্নভাবে অর্থ এসেছে, যেগুলো অডিটে যোগ হয়েছে। এ ছাড়া অনেকগুলো চেক এসেছিল, যেগুলো আমরা তখন ক্যাশ করাতে পারিনি। সেগুলো ক্যাশ করার পর এখানে যুক্ত করা হয়েছে। অনেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নামে চেক দিয়েছেন, কিন্তু তখনো এই নামে আমাদের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না।”

ব্যাংকে টাকা রাখা নিয়ে প্রশ্ন

ত্রাণ সংগ্রহের পরে ১৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সমন্বয়করা জানান, সংগৃহীত অর্থের বেশিরভাগই অব্যবহৃত অবস্থায় ব্যাংকে পড়ে রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এক ফেসবুক পোস্টে তখন জানিয়েছিলেন, “ব্যয় বাদে বাকি টাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক শাখা, ইসলামী ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সংরক্ষিত রয়েছে।”

এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ না করে ব্যাংকে ফেলে রাখা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। কেউ কেউ আবার “অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা হচ্ছে” বলেও অভিযোগ তুলছেন।

ত্রাণের টাকা ব্যাংকে কেন—বিবিসি বাংলার এমন প্রশ্নের জবাবে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “তহবিল সংগ্রহের শুরুতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, অর্থ সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে সব খরচ না করে বেশিরভাগই জমা রাখা হবে।”

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “আগের অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা জেনেছি যে, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরবর্তী ধাপে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর অর্থ সহায়তা বেশি প্রয়োজন হয়।”

বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ওই অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ব্যয় করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, “আরও আগে থেকেই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িঘর নির্মাণসহ অন্য কাজগুলো করে দেওয়ার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু আয়-ব্যয়ের অডিট সম্পন্ন না হওয়ায় সেটা সম্ভব হচ্ছিল না।”

হাসনাত আব্দুল্লাহ তখন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকার যে তহবিল গঠন করেছে, সেখানেই টাকাগুলো দেওয়া হবে। এর ফলে সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবেই আমাদের তহবিলের অর্থ মানুষের কাজে আসবে বলে আশা রাখি।”