অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে এখন ১০৩ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও ২৩০ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) রয়েছেন। এত বেশিসংখ্যক আইন কর্মকর্তা এর আগে কখনো ছিল বলে জানা যায়নি। তাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। এ দুই পদে এত বেশিসংখ্যক নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনবিশেষজ্ঞরা।
এত বেশিসংখ্যক আইন কর্মকর্তার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমরা দেখছি কী করা যায়। বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।’
অ্যাটর্নি জেনারেল একজন থাকবেন, সংবিধানে এটি সুনির্দিষ্ট করে বলা আছে। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল তিনজনের বেশি হবেন না, এটি বলা আছে ১৯৭২ সালের ‘বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার’-এ। তবে ডেপুটি ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদে ঠিক কতজনকে নিয়োগ দেওয়া যাবে, সেটি সংবিধান বা কোনো আইনে উল্লেখ নেই। যে কারণে যখন যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা তাদের পছন্দের আইনজীবীকে এসব পদে ইচ্ছা অনুযায়ী নিয়োগ দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আমরা দেখছি কী করা যায়। বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।মো. আসাদুজ্জামান, আইনমন্ত্রী
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সূত্রমতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে) বিভিন্ন সময়ে ৬০ থেকে ৬৮ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। তখন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন ১৪৩ জন। আর অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনজন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ওই সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া আইন কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের শুরুতে তিনজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও কয়েকজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদে আরও নিয়োগ হয়।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান মনে করেন, ৬০ থেকে ৮০ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১৬০ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের বেশি দরকার নেই। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগে অনেক ক্ষেত্রেই একটা আশঙ্কা দেখা যায় যে এটা যতটা না প্রয়োজন বা মেধার বিবেচনায় হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার উপজীব্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিকে আপিল বিভাগে একটি বেঞ্চ ছিল, পরে দুটি বেঞ্চ হয়। গত জানুয়ারি মাসের শুরু থেকে আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। এর পাশাপাশি আপিল বিভাগের দুটি চেম্বার আদালতেও বিচারিক কাজ চলছে। প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগে এখন বিচারপতি আছেন পাঁচজন।
প্রতিটি কোর্ট বা বেঞ্চে, বিশেষ করে মোশন বেঞ্চে (নতুন মামলা) দুই বা তিনজন করে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল থাকতে পারেন বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান খান। তিনি বলেন, শুনানির বেঞ্চে (রুল) এক বা দুজনের বেশি সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের দরকার হওয়ার কথা নয়। প্রতিটি মোশন বেঞ্চের জন্য একজন করে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল দরকার, যেখানে সরকারের (যেসব মামলার সরকারপক্ষ হিসেবে রয়েছে) মামলা বেশি। এর বাইরে রুল শুনানির জন্য যেসব বেঞ্চ রয়েছে—দুটি কিংবা তিনটি বেঞ্চ মিলিয়ে একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল দায়িত্বে থাকতে পারেন।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিকে আপিল বিভাগে একটি বেঞ্চ ছিল, পরে দুটি বেঞ্চ হয়। গত জানুয়ারি মাসের শুরু থেকে আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। এর পাশাপাশি আপিল বিভাগের দুটি চেম্বার আদালতেও বিচারিক কাজ চলছে। প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগে এখন বিচারপতি আছেন পাঁচজন।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগে ৩১ হাজার ১২০টি ও হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৬৫১টি মামলা বিচারাধীন ছিল। আর ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগে ৪১ হাজার ৫৫১টি ও হাইকোর্ট বিভাগে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল।
হাইকোর্ট বিভাগে রয়েছেন ১০৩ জন বিচারপতি। আর বর্তমানে বেঞ্চ (একক ও দ্বৈত) আছে ৬৫ থেকে ৬৭টি। সাধারণত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সরকার বা রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে মামলা লড়েন। অবশ্য কোনো কোনো বেঞ্চে দুজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলও দায়িত্ব পালন করেন। হাইকোর্টের প্রতিটি বেঞ্চে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে এক বা একাধিক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে সরকার বা রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে মামলা পরিচালনা ও শুনানিতে অংশ নেন।
রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার
প্রভাবমুক্ত স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের সুপারিশ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন এবং সংবিধান সংস্কার কমিশন। সংবিধান সংস্কার কমিশন গত বছরের ১৫ জানুয়ারি আর বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যোগ্যতা বা দক্ষতা বা সততা নয়, মূলত আইন কর্মকর্তাদের নিয়োগকে বিবেচনা করা হয় রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে। সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন পর্যায়ের আইন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের মান মোটেও সন্তোষজনক নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একটি স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।
সংবিধানের অধীন স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশনও। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এযাবৎ অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সব স্তরের আইন কর্মকর্তা নিযুক্ত হয়েছেন মূলত রাজনৈতিক বিবেচনা ও অপ্রতুল আইনি কাঠামোর আওতায়। আইন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন বিষয়ে জবাবদিহির কোনো আইনি কাঠামো নেই। মূলত আইন কর্মকর্তাদের নিয়োগকে বিবেচনা করা হয় রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে।
সংবিধান সংস্কার কমিশন বলেছে, অ্যাটর্নি সার্ভিস হবে একটি স্থায়ী পেনশনযোগ্য সরকারি চাকরি। এর জন্য সুনির্দিষ্ট কাঠামো, নিয়োগপদ্ধতি, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা, বেতনকাঠামোসহ আর্থিক সুবিধাদি ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে যথাযথ বিধানসংবলিত আইন থাকবে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের বিষয়টি বেঞ্চের সংখ্যা ও বিচারাধীন মামলার সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। দুই বছর আগের তুলনায় এখন তাঁদের সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, মামলার সংখ্যা সে হারে বেড়েছে কি না—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা দরকার। পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসা দরকার।
একটি অধ্যাদেশ ও রিট
রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে দক্ষ ও যোগ্য আইন কর্মকর্তা নিয়োগে স্থায়ী প্রক্রিয়া আইন অঙ্গনে দীর্ঘদিনের দাবি। ২০০৭-০৮ সালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অর্থাৎ ১৮ বছর আগে ‘সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ, ২০০৮’ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। তবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অধ্যাদেশ অনুমোদন করেনি। স্বাধীন প্রসিকিউশন সার্ভিস কমিশন গঠনের নির্দেশনা চেয়ে সাত বছর আগে উচ্চ আদালতে একটি রিটও হয়েছিল। সেই রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূইয়া ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর রিটটি করেন। রিটটির সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে রুলের ওপর আংশিক শুনানি হয়। পরে বেঞ্চ পুনর্গঠন হলে শুনানি আর এগোয়নি। শিগগিরই রুল শুনানির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুসারে, একজন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল প্রতি মাসে ভাতাসহ ৮০ হাজার টাকা পান। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পান ৯১ হাজার টাকা। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পান ১ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা। আর অ্যাটর্নি জেনারেল ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন।
প্রতি বেঞ্চে কতজন ডেপুটি ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল
অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের সামনের নোটিশ বোর্ডে আইন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন-সংক্রান্ত তালিকা টাঙানো থাকে। গত ৪ জানুয়ারির তালিকায় দেখা যায়, হাইকোর্টের ৬৬টি বেঞ্চে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলদের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। কোনো কোনো বেঞ্চে দুজন করে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে তিন-চারজন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এবং কোনো কোনো বেঞ্চে একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে তিন-চারজন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুসারে, একজন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল প্রতি মাসে ভাতাসহ ৮০ হাজার টাকা পান। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পান ৯১ হাজার টাকা। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পান ১ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা। আর অ্যাটর্নি জেনারেল ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন।
বিচারপতির সংখ্যা কম হওয়ায় এত বেশি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। বরং সরকারের উচিত হবে অ্যাটর্নি সার্ভিস আইন করা এবং আইনের মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে যোগ্যতর আইনজীবীদের এই দুই পদে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া।সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক
সুপারিশের পরও অধ্যাদেশ হয়নি
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের করা সুপারিশের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার ‘সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ’-এর প্রাথমিক খসড়া করেছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধ্যাদেশ জারি করা হয়নি।
খসড়ায় সুপ্রিম কোর্ট অ্যাটর্নি শাখা ও জেলা অ্যাটর্নি শাখা করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট অ্যাটর্নি শাখায় প্রবেশ পদ হবে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এবং জেলা অ্যাটর্নি শাখার প্রবেশ পদ হবে সহকারী জেলা অ্যাটর্নি।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিচারপতির সংখ্যা কম হওয়ায় এত বেশি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। বরং সরকারের উচিত হবে অ্যাটর্নি সার্ভিস আইন করা এবং আইনের মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে যোগ্যতর আইনজীবীদের এই দুই পদে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া।’