বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী মির্জা আব্বাস বলেছেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া বিএনপিকে ঠেকানোর কোনো উপায় নেই । নির্বাচন ঘিরে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র চলছে- দাবি করে তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোট হলে বিএনপি এবং তাকেও কেউ পরাজিত করতে পারবে না। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনী পরিবেশ, সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সরকার পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা নিয়েও তিনি আমাদের সময়ের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন।
দক্ষিণ শাহজাহানপুরে তার নিজ বাসভবনে সাক্ষাৎকারটি নেন আমাদের সময়ের সিনিয়র রিপোর্টার শাহজাহান মোল্লা ও মুক্তাদির হোসেন প্রান্তিক-
আমাদের সময় : নির্বাচনী প্রচার শেষ সপ্তাহে। নির্বাচনী পরিবেশ কেমন দেখছেন? নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা দেখছেন কিনা?
মির্জা আব্বাস : মানুষ নির্বাচনমুখী। মানুষ নির্বাচন করতে বা ভোট দিতে আগ্রহী। কেউ যদি সেই আগ্রহে বাধা সৃষ্টি করতে চায়, করতে পারে। কিন্তু এতে ভোটার যারা রয়েছেন, তাদের কেউ কন্ট্রোল করতে পারবে না, যেই করুক।
আমাদের সময় : স্বাধীনতাবিরোধী চক্র হঠাৎ করেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এটা কীভাবে দেখছেন। সামনে রাজনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হবে কিনা?
মির্জা আব্বাস : এরা বিদেশি সমর্থনপুষ্ট। বিশেষ করে কয়েকটি দেশের সমর্থনপুষ্ট, অনেক ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সমর্থনপুষ্ট। তাই এখন ওরা ওদের দাঁত বসাতে শুরু করেছে।
আমাদের সময় : এটা কী রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ? একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনি কী মনে করেন?
মির্জা আব্বাস : চ্যালেঞ্জ বলব না। আমি বলব মুসিবত। এরা সামনের বাংলাদেশের জন্য একটা মুসিবত।
আমাদের সময় : সামনের নির্বাচনে কি এই মুসিবত ঘাড়ে চেপে বসবে বলে মনে করেন?
মির্জা আব্বাস : তারা তো...। ওরা একটা প্ল্যান করেছে, নির্বাচনী প্ল্যান। আগামীতে জেতার জন্য, বিএনপিকে হারানোর জন্য নির্বাচনী প্ল্যান করেছে। সেই প্ল্যান যদি বাস্তবায়ন করে ফেলে... করার চেষ্টা তারা করবেই। যদি করতে পারে, তাহলে দেশের একটা ভয়াবহ সর্বনাশ হবে।
আমাদের সময় : তাদের সেই প্ল্যান মোকাবিলা করার জন্য আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কী?
মির্জা আব্বাস : ভোটকে ভোট দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। চক্রান্তকে চক্রান্ত দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু বিএনপি তো চক্রান্ত করে না, বিএনপি সারাজীবন ক্ষমতায় এসেছে ভোট করেই। কখনও চক্রান্ত করে আসেনি। এখন আমরা কী করব? যদি তারা চক্রান্ত করে। আমরা যদি সেটা বুঝতে পারি, তাহলে চেষ্টা করব মোকাবিলা করার।
আমাদের সময় : নানা মহল থেকে শোনা যায় ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে? নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো কোনো দলের একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা শোনা যায়। আপনারা কী মনে করেন?
মির্জা আব্বাস : সারা দেশের চিত্র যেটা, সেটা ঢাকারও চিত্র। হতে পারে ‘না’, এটা হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া ওদের সামনে কোনো রাস্তা নেই। এ জন্য ওরা জোর দিয়ে বলছে জিতবে। কিছু কিছু ব্যক্তি বলছে না? ১২ তারিখের পর দেখাইয়া দেব, ওরা কী কথা বলে আসছে ১২ তারিখে ওরা জিতবে নির্বাচনে? ওরা জানে কীভাবে। ভোট দেওয়ার মালিক জনসাধারণ। ভোট দেয়নি তো। তাহলে ওরা কীভাবে জানল জিতবে? ওরা চক্রান্ত করেই বলছে।
আমাদের সময় : বলা হয় আপনার সঙ্গে রাজনীতিতে পেরে না উঠে ব্যক্তিগত আক্রমণ করছে প্রতিপক্ষ। এটাকে কীভাবে দেখছেন? এ নিয়ে ইসিতে কোনো অভিযোগ করেছেন কিনা।
মির্জা আব্বাস : হ্যাঁ অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ না, ইসিকে জানানো হয়েছে প্রতিপক্ষ প্রার্থী এই কাজগুলো করছে। তার সম্বন্ধে বলা হয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশন কীভাবে নেবে, সেটা তো বলতে পারব না।
আমাদের সময় : ভোটার কেন্দ্রমুখী করার ক্ষেত্রে আপনাদের কোনো পদক্ষেপ আছে কিনা?
মির্জা আব্বাস : ভোটাররা কেন্দ্রমুখী হয়েই আছেন। ভোটাররা আমার, আপনার জন্য অপেক্ষা করবেন না। ওরা কেন্দ্রমুখী হয়ে আছেন ভোট দেওয়ার জন্য।
আমাদের সময় : আপনাকে নিয়ে যে ব্যক্তিগত সমালোচনাগুলো হয়, তার জবাব কী দেবেন।
মির্জা আব্বাস : আমি কী করব? কিছু করার আছে? কেউ যদি গালি দেয় তার জবাবে কী করা যায়। আমার কথা হলো... সেই কবিতার লাইনের মতো কুকুরের কাজ কুকুর করেছে কামড় দিয়েছে পায়ে... আমি তো কুকুরের পায়ে কামড় দিতে পারব না।
আমাদের সময় : কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ ভোটে নেই। তাদের ভোটার বা সমর্থক কোন দিকে যেতে পারে বা তাদের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী।
মির্জা আব্বাস : এটা যার যার ক্যাপাসিটি। যে যেভাবে পারে নিতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি না রাজনৈতিকভাবে বা ব্যক্তিগত তার প্রভাব পড়বে। এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার যদি আওয়ামী লীগের ভোটারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে, আমি তাদের নিতে পারি। ব্যবস্থা করতে পারি। আর আওয়ামী লীগের যদি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত থাকে কাকে ভোট দেবে, সে বিষয়ে তো আমার কিছু করার নাই।
আমাদের সময় : নির্বাচনে বিজয়ের বিষয়ে আপনি কতটুকু আশাবাদী।
মির্জা আব্বাস : ইলেকশন যদি হয়। যদি ইঞ্জিনিয়ারিং না হয়, তাহলে আমি পাস করে যাব ইনশা আল্লাহ।
আমাদের সময় : দলগতভাবে বিএনপির কী অবস্থা?
মির্জা আব্বাস : বিএনপির একই অবস্থা। পাস করবে বিএনপি।
আমাদের সময় : আপনারা সরকার গঠনের ব্যাপারে কতটুকু আশাবাদী?
মির্জা আব্বাস : হ্যাঁ, সত্যিকার অর্থেই যদি ইলেকশন হয়। আর যদি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়, তাহলে তো বলা মুশকিল।
আমাদের সময় : আপনি কি আশঙ্কা করছেন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে?
মির্জা আব্বাস : হ্যাঁ, একশত ভাগ।
আমাদের সময় : সে ক্ষেত্রে সরকার কী ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ওয়াকিবহাল না?
মির্জা আব্বাস : আমি প্রার্থী। সরকারের বিষয়ে কোনো কথা বলব না।
আমাদের সময় : আপনার ভোটারযোগ কেমন।
মির্জা আব্বাস : ভোটারদের অনুষ্ঠানে আমি যাই। ভোটাররা আয়োজন করে আমি যাই। আমি সব জায়গায় যেতে পারি আমার সেই একসেস আছে। ভোটারদের সঙ্গেই আমার কথা হয়।
আমাদের সময় : আপনি যে আসন থেকে নির্বাচন করছেন, সেই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। এই আসনের ভালো-মন্দ সবকিছু আপনার জানা। তথা দেশের কথাও আপনার ভালো জানা। আপনি নির্বাচিত হলে এই আসন নিয়ে কী পরিকল্পনা।
মির্জা আব্বাস : যে সমস্যাগুলো আমি জানি সেগুলো সমাধান করব।
আমাদের সময় : কী কী সমস্যা জানেন?
মির্জা আব্বাস : প্রথম সমস্যা জলাবদ্ধতা। এটা শুধু আমার এলাকা না, পুরো ঢাকা শহরজুড়েই এই সমস্যা। এটা শেষ করতে হবে। আমাদের মুগদা হাসপাতালকে আরও আধুনিক করতে হবে। যদিও আমার এলাকার বাইরে পড়েছে এখন। যদিও মুগদা হাসপাতাল এখন আধুনিক, আরও আধুনিক করতে হবে। কিছু কাজ বাকি ছিল আমার। যদিও অন্য আসনে পড়েছে। সেগুলোও করব।
আমাদের সময় : আপনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ছিলেন। যদি আবার সেই সুযোগ আসে ঢাকার আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে?
মির্জা আব্বাস : প্রথমত আমাদের পরিবহনব্যবস্থা আপডেট করলে ঢাকার আবাসন সমস্যা থাকবে না। এটা ইঞ্জিনিয়াররা কেন বোঝে না, আমি বুঝলাম না। আমেরিকা গেলে দেখবেন এক সিটি থেকে আরেক সিটিতে গিয়ে মানুষ কাজ করে নিরাপদে ফিরতে পারছে। এক সিটি থেকে অন্য সিটিতে যেতে সময় লাগে ৩০-৪০ মিনিট। ভূমিদস্যুদের হাতে আমাদের যে ঘটনা ঘটে গেল বাংলাদেশে, এটা হওয়ার কথা না। যদি যত্ন নেওয়ার লোক থাকত ঢাকায়। ঢাকায় যত্ন নেওয়ার লোক ছিল না। আমি চেষ্টা করেছি ঢাকা শহরকে বাঁচানোর জন্য কিন্তু পারলাম না সময় এবং সুযোগের অভাবে।
আমাদের সময় : নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যদি বিএনপির সরকার গঠনের সুযোগ পায়, তাহলে সরকারের কূটনৈতিক নীতি কী হওয়া উচিত। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে ভারতের সঙ্গে যে বৈরী সম্পর্ক রয়েছে সেটা কাটিয়ে ওঠা বা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের সঙ্গে কেমন নীতি অবলম্বন করা উচিত বলে মনে করেন।
মির্জা আব্বাস : আমি পররাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করি না। সুতরাং, এটা নিয়ে বলাও ঠিক না। তবে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির আউটলাইন আগে ঠিক করতে হবে। ঠিক করে আগে বাড়তে হবে। আমি একটা সিরিয়াল দেখি ইন্ধিরা গান্ধীর লাইফ স্টাইল নিয়ে। ইন্দিরা গান্ধী তার জীবনে একবার ইমারজেন্সি দিয়েছিলেন। অনেক সমালোচনার মুখে ইমারজেন্সি দিয়েছিলেন। তার পুরো দল ইমারজেন্সির বিরোধী ছিল, কিন্তু তিনি ইমারজেন্সি দিয়েছিলেন দেশের প্রয়োজনে, জাতির প্রয়োজনে। তিনি অনুভব করেছিলেন ইমারজেন্সি দেওয়া দরকার। আমাদেরও এ রকম হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। আমার ব্যক্তিগত মত আমাদের দেশের জন্য যেটা প্রয়োজন, সেখান থেকে সরব না। এটা ঠিক রেখে সবার সাথে চলব। যেটা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বারবার করতেন। আমরা যদি পররাষ্ট্রনীতিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতি ফলো করি, তাহলে আর কিছু লাগবে না।
আমাদের সময় : বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ, হঠাৎ করে উগ্রপন্থার উত্থানÑ এই বাস্তবতায় আগামী সরকার যারাই আসুক, কোনো চ্যালেঞ্জ দেখেন কিনা?
মির্জা আব্বাস : সরকার পরিচালনা করতে হবে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে। সরকার পরিচালনা করা কঠিন হবে। কিন্তু সরকার পরিচালনা করতে হবে। দেশ বাঁচানোর স্বার্থে, মানুষ বাঁচানোর স্বার্থে। ওই যে বললাম নাÑ একটা সময় ইন্দিরা গান্ধীকে ইমারজেন্সি দিতে হয়েছিল। ইমারজেন্সি দেওয়ার জন্য তাকে হাতকড়া পরানো হয়েছিল। সে তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী।
আমাদের সময় : ভোটের পরও কী তেমন কোনো আশঙ্কা দেখছেন?
মির্জা আব্বাস : ২০০১ সালে যখন আমরা ক্ষমতায় আসি, তখন শেখ হাসিনা বলেছিলেনÑ এক মিনিটের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেবেন না। সেই একই কাজ করবে ওরা।
আমাদের সময় : তারা তো নেই। তাদের কী ফিরে আসার সুযোগ আছে?
মির্জা আব্বাস : আওয়ামী লীগের ‘বি টিম’ আছে না বাংলাদেশে?
আমাদের সময় : দীর্ঘক্ষণ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মির্জা আব্বাস : আপনার মাধ্যমে আমাদের সময়ের পাঠকদেরও ধন্যবাদ।