Image description
  • দীর্ঘ সময় ধরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে, একই সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দুর্নীতি, রাষ্ট্র সংস্কার, আসন্ন নির্বাচন, মব সংস্কৃতি, অর্থপাচার ও সুশাসন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন তিনি। কালের কণ্ঠের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

    দুর্নীতি প্রতিরোধে চারটি উপাদান অপরিহার্য

    দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে করণীয় কী—এমন এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে চারটি উপাদান অপরিহার্য। প্রথমত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বিশেষে সবাইকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর করতে হবে।

    চতুর্থত, দেশের প্রতিটি মানুষকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। সাধারণ মানুষ চায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতিবাজদের বিচার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা। এই চারটি উপাদান মিললেই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।’

     

     

    অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ কতটা সফল

    অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল তার কতটা সফল হয়েছে—এমন আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে।

    সংস্কার কমিশন, ঐকমত্য কমিশন, একাধিক হোয়াইট পেপার কমিটি গঠন, বিচার বিভাগকে       স্বাধীন করতে সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। তবে উদ্বেগের জায়গা হলো, অনেক মৌলিক ও কৌশলগত সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাতিল

     

    করা হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন, কিন্তু জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুদক কিংবা পুলিশ কমিশনার সংস্কারে অ্যাডহক পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে, যা হতাশাজনক।

     

    দুদক কেন কার্যকর হচ্ছে না

    দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা কেমন হয়েছে জানতে চাইলে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটি কোনো ব্যক্তিগত মত নয়, কমিশনের ৪৭টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ ছিল।

    জরুরি সুপারিশ বাস্তবায়নে অর্ডিন্যান্স বা সরকারি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল, কিন্তু বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। কারণ, দুদকের অভ্যন্তরে গুরুতর দুর্নীতি রয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের বরখাস্ত ও আদালতে সোপর্দ করার সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

     

     

    নারী প্রতিনিধিত্ব ও ধর্মের রাজনীতি

    ঐকমত্য কমিশনে নারী সদস্য না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে অর্থ, পেশিশক্তি ও ধর্মের প্রতিযোগিতা চলছে।

    গত ১৫ বছরে ধর্মীয় রাজনীতির উৎকট বিকাশ ঘটেছে। জুলাই-পরবর্তী সময়েও রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্ম প্রাধান্য পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নতুন ও মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যা বাংলাদেশের সত্তা এবং ’৭১ ও ’২৪-এর মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ধর্মপ্রাণ হয়েও ধর্ম ও রাজনীতির পার্থক্য আমাদের প্রজন্ম দেখেছে। এই অপশক্তিকে প্রতিহত করা জরুরি।’

     

     

    মব সংস্কৃতি ও আইন-শৃঙ্খলা

    মব সংস্কৃতি ও নির্বাচনের আগের সহিংসতা প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মব সংস্কৃতির উৎপত্তি বুঝতে হলে গত ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদের জঞ্জাল বুঝতে হবে। পতিত কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পর অনেকেই ‘এটা আমাদের পালা’ সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ৫ আগস্টের পর দলবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, মামলা, গ্রেপ্তার ও জামিন বাণিজ্য এক ধরনের স্বাভাবিকতায় রূপ নিয়েছে। এই সংস্কৃতির নিউক্লিয়াস প্রথমে সচিবালয়ের ভেতর তৈরি হয়, পরে তা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে অনেক সময় যৌক্তিক চাহিদার আন্দোলন বলপূর্বক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছে।’

    তিনি বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী দীর্ঘদিন কর্তৃত্ববাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় তাদের নৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার এই শক্তিকে কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। এখানে আরেকটা উপাদান মনে রাখতে হবে, যারা পতিত শক্তি, তারা কিন্তু নিষ্ক্রীয় নয়। তাদের অর্থ এবং পেশিশক্তি কোনোটিরই ঘাটতি নেই। এই অস্থিতিশীল প্রেক্ষিত সৃষ্টির পেছনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে আমাদের প্রতিবেশী দেশ থেকে কী ধরনের ইন্ধন বা ঝুঁকি আসছে, সেটাও ভুললে চলবে না। আমাদের প্রতিবেশী দেশ তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডিপ্লোমেটিক এবং পলিটিক্যাল পরাজয় মেনে নিতে পারেনি। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচারণা ও অস্থিতিশীলতার উপাদান সৃষ্টি করছে।’

     

    নির্বাচন হবে, তবে ঝুঁকিও আছে

    আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত দিনেই দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে মনে করছি। তবে তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিও আছে। এই ঝুঁকি কমাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার জরুরি। সম্প্রতি দুটি সংবাদমাধ্যমের ওপর যে আক্রমণ হয়েছে, আমি পাবলিকলি বলেছি, এটি প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আমি মনে করি, জনগণের শক্তি এবং যারা গত ১৬ বছর ত্যাগ স্বীকার করেছে, তারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন এবং প্রপার ট্রান্সফার অব পাওয়ার চায়। জনগণের শক্তির সঙ্গে যদি প্রতিষ্ঠানের অর্পিত দায়িত্বের সমন্বয় করা যায়, তবে অবশ্যই সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন আশা করা যায়।’

     

    ১৬ বছরে পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার

    অর্থপাচার প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘গত ১৬ বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পাচার করা অর্থের মাত্র ১ শতাংশ ফেরত আসে এবং এতে সাত থেকে ১০ বছর সময় লাগে। তবে এর মানে এই নয় যে অর্থ ফেরত আনা সম্ভব নয়। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা কঠিন। কারণ যে দেশে টাকা গেছে, সেই দেশের অর্থনীতিতে ওই অর্থ অবদান রাখছে। ওই দেশের আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে এটি অবৈধভাবে এসেছে। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার জন্য আন্তর্জাতিক আইনগত কাঠামো আছে। আমি আশাবাদী, দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের ধৈর্য থাকলে পাচার করা অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হবে।

     

    ৭৯ শতাংশ মানুষ ঘুষ ছাড়া সেবা পায় না

    বাংলাদেশ কি প্রত্যাশিত রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দুর্নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, স্বাধীনতার চেতনা ও চব্বিশের মূল্যবোধ অনুযায়ী দুর্নীতিমুক্ত সুশাসিত রাষ্ট্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাষ্ট্র যখন কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়, তখন তা আইনের বিরুদ্ধে যায় এবং সমাজে ভুল বার্তা দেয়। টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৯ শতাংশ মানুষ ঘুষ না দিলে সেবা পায় না। এই বাস্তবতা মানুষকে দুর্নীতিতে বাধ্য করছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা গণতান্ত্রিক ও দুর্নীতিমুক্ত না হলে কখনোই দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।