Image description

ড. দিলীপ কুমার বড়ুয়া কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জাপানের আইচি গাকুইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন এবং জাপান সরকারের জেএসপিএস স্কলারশিপে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা সমাপ্ত করেন। ড. বড়ুয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগদান ও প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। ১৯ জানুয়ারি মেজর জিয়াউর রহমানের জন্মদিন। এ দিবস উপলেক্ষ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই ঘোষকের পুরো শাসনামলের বিভিন্ন দিক নিয়ে দিলীপ কুমার বড়ুয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সাথে কথা বলেছেন।

তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ হোসেন আসকালানী ও নাজমুস সালেহীন বিন সাইফ। 

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: জিয়াউর রহমানের প্রাথমিক জীবন কেমন ছিলো? মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দেশের জন্য জিয়ার অবদানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

দিলীপ কুমার বড়ুয়া: আমরা মেজর জিয়াউর রহমানকে সবচেয়ে বেশি চিনেছি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। তার প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে জানা যায়, মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগ দেন। বিশেষ করে, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তার সাহসিকতা ও কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে তিনি শুধু সামরিক মহলেই নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত হন। সে সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালি সেনাদের প্রতি যে অনাস্থা এবং বিশ্বাসের ঘাটতি ছিল, জিয়াউর রহমানের বীরত্বপূর্ণ অবদানের ফলে তা অনেকটাই দূর হয় এবং বাঙালি সৈন্যদের প্রতি আস্থা ফিরে আসে। ঐ যুদ্ধে সাহসিকতার পুরস্কার স্বরূপ তার কোম্পানিকে সর্বাধিক বীরত্বসূচক খেতাব প্রদান করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার সবচেয়ে ঐতিহাসিক অবদান ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ। এই ঘোষণা দেশের মানুষের মধ্যে প্রবল উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে। 

জনগণ শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিক শক্তি পায়। তিনি যখন বললেন ‘we revolt’ তখন জনগণ, বিদেশিরা কিংবা আন্তর্জাতিক মহল বুঝতে সক্ষম হয় যে এ যুদ্ধে সেনাবাহিনীরও প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে। এভাবে শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও এই ঘোষণা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায় এবং বাংলাদেশের সংগ্রাম একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় পায়। আমি মনে করি, জিয়াউর রহমানের ঘোষণাপাঠ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। যা মানুষের মনের মধ্যে ত্বরিত পরিবর্তন এবং ‘পাকিস্থানিদের হটাও’ এ ধরনের মনোভাব আনয়নে ভূমিকা রাখে। জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সত্যিকারের ফিল্ড মার্শাল। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উঠে এসে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়া বাংলাদেশের একমাত্র ফিল্ড মার্শাল তিনি।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: সিপাহি জনতার বিপ্লব কীভাবে হলো? 

দিলীপ কুমার বড়ুয়া: সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী যারা কঠোরভাবে চেইন অব কমান্ড অনুসরণ করে। বয়স, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার দিক থেকে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হওয়ার সম্পূর্ণ উপযুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন মেজর জেনারেল শফিউউল্লাহরও সিনিয়র। কিন্তু রাজনৈতিক ও স্বজনপ্রীতির কারণে তাকে বঞ্চিত করা হয়, যা সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। সেনাবাহিনী একটি চেইন অফ কমান্ড অনুসরণ করে চললেও জিয়াউর রহমানকে তার প্রাপ্য যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত করা হলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। একই সাথে জনতার ভালোবাসায়ও জিয়াউর রহমান সিক্ত হন। ১৫ আগস্টের সেনাবিদ্রোহের পর কর্নেল সাফায়াত জামিল ও খালেদ মোশাররফের অনুসারীরা প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে বন্দী করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতা বিপ্লব সংঘটিত হয়। ওই বিপ্লবে সেনাসদস্য ও সাধারণ জনগণের সমর্থনে তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন এবং জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা।  

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: জিয়াউর রহমানের গৃহীত ‘জাতীয় অর্থনৈতিক নীতিমালা’ কীভাবে বাংলাদেশের ভিতকে মজবুত করে? তার ঘোষিত ১৯ দফা কীভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আজও প্রাসঙ্গিক?

দিলীপ কুমার বড়ুয়া: প্রথমত জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত সৎ ব্যক্তি। আমি গবেষণা করে পেয়েছি যে তিনি অনৈতিক সুবিধা একবিন্দুও গ্রহণ করেননি। অন্যান্যের মত তার মধ্যে স্বজনপ্রীতি ব্যাপারটি একদম দেখা যায়নি। একারণেই তার কোনো আত্মীয়-স্বজনের নাম আমরা শুনিনি এবং তিনি মৃত্যুবরণ করার পরে তার পরিবারের জন্যও কিছু রেখে যেতে পারেননি। তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট বুঝার জন্য তাদের সম্পর্কে অনেক স্টাডি করতেন। সাধারণ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে তিনি তার পরিকল্পনা সাজাতেন। তিনি যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন, তখন বাংলাদেশ ছিল একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত, অন্যদিকে দুর্ভিক্ষপীড়িত একটি দেশ। এই দুর্ভিক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যায়, অর্থনীতি হয়ে পড়ে চরম ভঙ্গুর।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেই তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দেশকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম কৃষি খাতকে স্বনির্ভর করার প্রতি মনোযোগ দিলেন। কারণ, তখন বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ মানুষের জীবিকা ছিল কৃষিনির্ভর। কৃষিকে আরও সাবলীল করার জন্য তিনি খালখনন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিনি সশরীরে অনেক খালখনন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। দেড় বছরের মধ্যে দেড় হাজারেরও অধিক খাল খনন ও পুনঃখনন, পরপর দুই বছর (১৯৭৬-৭৭ ও ১৯৭৭-৭৮) খাদ্য শস্যের রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন ও ১৯৭৬-৭৮ সালে দেশে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ৬.৪% অর্জন করতে সক্ষম হয় জিয়াউর রহমানের সরকার।

কৃষিকে চাঙ্গা করার এই পরিকল্পনার পাশাপাশি তিনি রপ্তানীমুখি চিন্তাভাবনা শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কৃষি উৎপাদনের মধ্য দিয়ে দেশের প্রয়োজন মিটলেও দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল হবে না। এজন্য তিনি কালুরঘাটে দেশ গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রথম গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রা শুরু করেন। এর মাধ্যমেই বিদেশে প্রথম বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি শুরু হয়। তিনিই প্রথম বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মানবসম্পদ সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং ৬০৮৭ জন কর্মীকে কুয়েত প্রেরণ করেন। এর মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বিস্তৃতি লাভ করে। দেখুন বর্তমানে এই দুটি বিষয়েই বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। 

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: সার্ক গঠন উল্লেখপূর্বক জিয়ার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিকে আপনি কীভাবে পর্যালোচনা করবেন? 

দিলীপ কুমার বড়ুয়া: জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রপতি হন তখন এদেশের অবস্থা ছিল সদ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত, দুর্ভিক্ষপীড়িত এবং রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল। তিনি এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজন অনুভব করলেন। তিনি খুব দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন, এককভাবে কোনো দেশ টেকসই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। ইউরোপীয় অর্থনৈতিক জোটসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণা সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তখন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থায় ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই দুর্বল দেশগুলো একত্র হলে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বলয়ে তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ ১৯৭৮ সালে নিরাপত্তা পরিষদের একটি অস্থায়ী আসনে সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা উদ্ভাবন করেন এবং এ সহযোগিতা গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

এতদুদ্দেশ্যে তিনি ১৯৭৯-৮০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সফর করে পারস্পরিক সহযোগিতার একটি সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) তারই প্রচেষ্টার ফসল। সার্ক প্রতিষ্ঠার ভাবনাই প্রমাণ করে জিয়া ছিলেন একজন বিশ্ব নেতা। জিয়াউর রহমান তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেন নি। মূলত, জিয়াউর রহমানের অভ্যন্তরীণ নীতি ছিল দেশের ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং বৈদেশিক নীতি ছিল 'শান্তি ও সহযোগিতার' মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরি করা।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রবর্তনের কারণ কী ছিলো? কেন এই মতবাদ দেশের মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো?

দিলীপ কুমার বড়ুয়া: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাটিও ছিল তার অন্যতম মৌলিক চিন্তার ফসল। এই দর্শনের মাধ্যমে তিনি দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলাদেশ শুধু বাঙালিদের রাষ্ট্র নয়। এখানে বাঙালিদের পাশাপাশি চাকমা, মারমা, গারো, হাজং সহ নানা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। সবাইকে শুধু ‘বাঙালি’ পরিচয়ে আবদ্ধ করলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর পরিচয় সংকটে পড়বে, যা ভবিষ্যতে সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। এই বাস্তবতা বিবেচনা করেই তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা সামনে আনেন, যেখানে সব জাতি, ধর্ম ও গোষ্ঠীর মানুষের সম্মিলিত পরিচয়ই বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়। 

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: একজন সামরিক অফিসার থেকে সফল রাষ্ট্রনায়ক: কীভাবে সারা বিশ্বে তা বিরল নজির হিসেবে স্থাপিত হলো?

দিলীপ কুমার বড়ুয়া: দুঃখজনকভাবে, তার এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও পরিকল্পনাগুলো পূর্ণ বাস্তবায়নের সুযোগ পাননি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তবে অল্প সময়ের শাসনকালেই অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে তিনি যে ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও অসাধারণ অবদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থনীতি, শিল্প কিংবা শিক্ষাক্ষেত্রসহ সব দিক বিবেচনায় নিলে জিয়াউর রহমান অল্প সময়ের মধ্যে যে কাজগুলো করে গেছেন, তা দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা অনেক রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গেও তুলনাহীন। বিশেষ করে পোশাক শিল্পের সূচনা, কৃষি ও শিল্পের সমন্বিত উন্নয়ন এবং শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, এই তিনটি ক্ষেত্রেই তার অবদান ছিল যুগান্তকারী। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে তিনি স্বল্প সময়েই অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথে নিয়ে যান, যা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনি জানেন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান খুবই নাজুক। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েও শিক্ষা সংস্কার কমিশন করা হলো না। আপনি বলবেন কি বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় জিয়াউর রহমানের শিক্ষা দর্শন কেন গুরুত্বপূর্ণ? 

দিলীপ কুমার বড়ুয়া: জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে ব্যাবহারিক ও কারিগরি শিক্ষার সমন্বয় সাধন করা হয়, বিশেষত দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে। এসময় বাংলাদেশে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছিল: ড. মফিজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশন (১৯৭৭)। সেই কমিটি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে। অন্যটি প্রফেসর মুস্তফা বিন কাসিমের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটি (১৯৭৮)। তারা কুদরত-এ-খুদা কমিশনের রিপোর্টের আলোকে বাস্তবমুখী শিক্ষার সমন্বয় চেয়েছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতীয় সংসদে ১৯৭৯ সালের ২ এপ্রিল বক্তৃতাকালে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাকে ‘জাতির জন্য কল্যাণকর’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এমনকি প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি জোর দেন।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৮০ সালে তিনি সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা চালু করেন। UNDP কর্তৃক গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য তার গৃহীত পদক্ষেপগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। সেই ধারাবাহিকতা বেগম খালেদা জিয়াও বজায় রাখেন। তিনি ১৯৯২ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ খুলেন। সেই লক্ষ্য খালেদা জিয়া খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি চালু করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন শিক্ষার আলো ছড়াতে হলে সবার আগে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করা দরকার। পরবর্তীতে ঐ বিভাগটি চার দলীয় জোটের সময় ২০০৩ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে রূপান্তর করা হয়।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: বাংলাদেশের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী ও ‘জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’ বেগম খালেদা জিয়া কিছুদিন আগে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে নিয়ে কিছু বলুন।

দিলীপ কুমার বড়ুয়া: বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন ‘মাটি ও মানুষের’ নেত্রী ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সংযোগ ছিল গভীর ও স্বতঃস্ফূর্ত। তার প্রয়াণ শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার সমাপ্তি নয় বরং মানবজাতির জন্য এক গভীর শোক ও অপূরণীয় ক্ষতি। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা নিজের চোখেই দেখেছি, কীভাবে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছে। 

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তার আদর্শ বহন করার দায়িত্ব যাঁরা গ্রহণ করেন, তাদের সংগ্রামও সহজ ছিল না।

নানা বাধা, নিপীড়ন ও সহিংসতার মধ্য দিয়েই সেই রাজনীতি এগিয়েছে। তবু আপস না করা, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার দৃঢ়তা তাকে মানুষের আস্থা অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে। জেনারেল এরশাদ আমলে আট বছরে সাত বার তাকে অন্তরিন করা হয়। তবুও খালেদা জিয়া এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে ক্রমাগত চাপ অব্যাহত রেখেছিলেন। ১৯৯৩ সালের সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে তিনি সংস্থাটির চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। এতে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পায়। যাহোক, জিয়াউর রহমান দেশের অর্থনীতির যে ভিত গড়ে তুলেন বেগম খালেদা জিয়া তাকে আরও সমৃদ্ধ করেন। এককথায় বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজনীতি ও শিক্ষানীতিতে যে অবদান তিনি রেখেছেন, তা কখনো বাংলাদেশের মানুষ ভুলবে না 

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আমাদের সময় দেবার জন্য স্যার আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। 

দিলীপ কুমার বড়ুয়া: আপনাদেরও ধন্যবাদ। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের আমার শুভেচ্ছা।